EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

লালনের মানবতাবাদ: ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

ডেইলি সান রিপোর্ট, ড. আমানুর আমান

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

লালনের মানবতাবাদ: ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

মানুষের পরিচয় কি তার ধর্মে, বর্ণে, জাতিতে, নাকি তার মানবিক সত্তায়—এই প্রশ্ন বহু শতাব্দী ধরে সমাজ ও সভ্যতাকে ভাবিয়ে তুলেছে। মানুষে মানুষে বিভেদ, জাতপাতের অহংকার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে কজন মনীষী মানবতার জয়গান গেয়েছেন, ফকির লালন শাহ তাঁদের অন্যতম। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ, তাঁর সাধনার লক্ষ্য ছিল মানুষের অন্তর্নিহিত সত্যের অনুসন্ধান, আর তাঁর গানের মূল সুর ছিল মানবিক মুক্তি। তাই লালনকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন সাধক, গীতিকার কিংবা বাউলশিল্পীকে স্মরণ করা নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা, সাম্য ও সম্প্রীতির পক্ষে এক চিরন্তন দার্শনিক অবস্থানকে নতুন করে উপলব্ধি করা।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের অনুষ্ঠান সোমবার সন্ধ্যায় শেষ হয়েছে। আলোচনা সভা, লালনসংগীত, সাধুসঙ্গ ও লোকজ মেলার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে এবারের আয়োজন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাউল সাধক, লালনভক্ত ও দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি অনুসারীদের উপস্থিতিও অনুষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তবে এ আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল লালনের অহিংস, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে সমাজের গভীরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান। এই আহ্বান শুধু একটি স্মরণানুষ্ঠানের বক্তব্য নয়; বরং আমাদের বর্তমান সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। 

লালন: পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের সন্ধান

লালনের দর্শন বুঝতে হলে তাঁর গানের অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলো উপলব্ধি করতে হবে। তিনি মানুষকে কেবল বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করেননি। ধর্মীয় আচার, জাতিগত পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রচলিত সংস্কারের চেয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দর্শনে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের একচেটিয়া সম্পদ নয়; মানুষ নিজেই অনুসন্ধানের বিষয়, সাধনার কেন্দ্র এবং মানবিক উপলব্ধির প্রধান অবলম্বন।

লালনের বহুল আলোচিত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ শুধু একটি লোকগীতি নয়; এটি জাতপাত ও পরিচয়ভিত্তিক সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে এক গভীর দার্শনিক প্রতিবাদ। মানুষকে জাতের পরিচয়ে আবদ্ধ করার প্রবণতা যে তার প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল করে, সেই সত্য তিনি সহজ অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় তুলে ধরেছেন। একইভাবে তাঁর ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ গান মানুষের দেহ, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের রহস্য নিয়ে ভাবতে শেখায়। তাঁর গানের ভাষা লোকজ হলেও চিন্তার পরিসর গভীর ও সর্বজনীন।

লালনের মানবতাবাদ কোনো বিমূর্ত আদর্শে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর দর্শন মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আত্মোপলব্ধি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। যে সমাজে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার জন্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচিতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে, সেখানে লালনের দর্শন মানুষকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, পরিচয়ের বহিরাবরণ দিয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। 

বর্তমান সমাজে লালনের দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও যোগাযোগব্যবস্থায় অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করলেও মানুষে মানুষে বিভাজনের বহু পুরোনো প্রবণতা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতিগত বিদ্বেষ, সামাজিক বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বিভিন্ন সমাজে নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা অনেক সময় মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার প্রবণতাও পারস্পরিক সহাবস্থানকে দুর্বল করে।

এই বাস্তবতায় লালনের দর্শন নতুন তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। তাঁর শিক্ষা হলো, ভিন্নতা মানেই শত্রুতা নয়, মতপার্থক্য মানেই বিরোধ নয়, আর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা মানুষের মর্যাদা কমিয়ে দেয় না। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু, ধনী ও দরিদ্র, নারী ও পুরুষ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কিংবা ভিন্ন মতের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা সমানভাবে স্বীকৃত হয়।

লালনের মানবতাবাদ আমাদের শেখায়, মানুষের প্রতি ভালোবাসা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানবিকতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নিজের পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে অপরের প্রতিও প্রসারিত হয়। যে ব্যক্তি নিজের বিশ্বাসকে ধারণ করেন, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসের অধিকারকে অস্বীকার করেন না, তিনিই প্রকৃত অর্থে সহনশীলতার চর্চা করেন। লালনের দর্শন এই সহাবস্থানের সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

উৎসবের বাইরে লালনচর্চা

প্রতিবছর লালনের তিরোধান দিবস ও জন্মস্মরণে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে মানুষের সমাগম ঘটে। গান, সাধুসঙ্গ, আলোচনা ও মেলার মধ্য দিয়ে লালনকে স্মরণ করা হয়। এসব আয়োজন বাংলা লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। দেশি-বিদেশি মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, লালনের গান ও দর্শন ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—লালনের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা কি মূলত উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে? তাঁর গান গাওয়া, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আখড়াবাড়ি পরিদর্শন এবং প্রতিবছর নির্দিষ্ট দিনে তাঁকে স্মরণ করা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু তাঁর দর্শনের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব, যখন সেই দর্শন আমাদের আচরণ, চিন্তা ও সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।

যদি আমরা লালনের গান গাই, অথচ অন্যের ধর্মীয় পরিচয়কে অবজ্ঞা করি; তাঁর মানবতার কথা বলি, অথচ জাতপাত ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করি; তাঁর অসাম্প্রদায়িকতার প্রশংসা করি, অথচ ভিন্নমতের মানুষকে সহ্য করতে না পারি, তাহলে আমাদের লালনচর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ দর্শন কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়, তা জীবনযাপনেরও বিষয়।

লালনকে যথার্থভাবে ধারণ করতে হলে তাঁর গান ও বাণীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। তাঁর দর্শনের আলোকে নিজেদের পূর্বধারণা, সামাজিক আচরণ এবং অন্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনে সহমর্মিতা, সামাজিক জীবনে সহনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই লালনের প্রতি শ্রদ্ধা অর্থবহ হতে পারে। 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও মানবিক সমাজ নির্মাণ

লালনের দর্শন প্রচার ও চর্চার ক্ষেত্রে বাউল সাধক, শিল্পী, গবেষক ও অনুসারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর গানের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ, বাউল সাধনার ঐতিহ্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর দর্শন পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদের রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এই দায়িত্ব কেবল ব্যক্তি কিংবা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাষ্ট্রকেও এখানে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

একটি আধুনিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকদের সমান অধিকার, আইনের সমান প্রয়োগ এবং ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের নীতি, আইন, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যহীনতার প্রতিফলন থাকতে হবে। কোনো নাগরিক যেন তার ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ভিন্নমতের কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ ক্ষেত্রে লালনের দর্শন রাষ্ট্রের জন্য নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেরণা হতে পারে। তবে তাঁর মানবতাবাদকে কেবল রাষ্ট্রীয় বক্তৃতা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আলোচ্য বিষয় করে রাখলে চলবে না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বৈষম্য ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: লালনের দর্শন কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক নীতিমালা নয়। কিন্তু মানুষের মর্যাদা, সহনশীলতা, বৈষম্যবিরোধিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মতো মূল্যবোধ রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে। লালনের দর্শনকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার অর্থ হলো, তাঁর মানবিক চেতনাকে আধুনিক নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোকে প্রয়োগ করা। 

নতুন প্রজন্মের কাছে লালনকে পৌঁছে দিতে হবে

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নতুন প্রজন্ম কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠছে, তার ওপর। তাই লালনের মানবতাবাদী দর্শনকে তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তবে এ কাজ কেবল পাঠ্যবইয়ে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা কিংবা তাঁর কয়েকটি গান মুখস্থ করানোর মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হবে না। প্রয়োজন তাঁর চিন্তার গভীরতা উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লালনের গান, দর্শন ও জীবনভাবনা নিয়ে আলোচনা, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গবেষণামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা যেতে পারে। তাঁর গানের দার্শনিক তাৎপর্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বই, প্রামাণ্যচিত্র, পডকাস্ট ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বিদ্বেষ ও বিভাজনের পরিবর্তে মানবিকতা, সম্প্রীতি এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লালনের দর্শন অনুপ্রেরণা দিতে পারে।

একই সঙ্গে লালনচর্চাকে গবেষণাভিত্তিক ও তথ্যনিষ্ঠ করতে হবে। তাঁর গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, যথাযথ পাঠ নির্ধারণ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং বাউল সাধনার মৌখিক ঐতিহ্য নথিবদ্ধ করার উদ্যোগ জোরদার করা দরকার। লালনের নামে প্রচলিত প্রতিটি বক্তব্য বা গানের পঙ্‌ক্তিকে যাচাই ছাড়াই তাঁর রচনা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। তাঁর প্রকৃত চিন্তা ও সৃষ্টিকে সংরক্ষণ করাই তাঁর প্রতি দায়িত্বশীল শ্রদ্ধার পরিচয়। 

লালনের উত্তরাধিকার রক্ষায় সংস্কৃতির সুরক্ষা

লালনের দর্শন কেবল তাঁর গানের কথায় সীমাবদ্ধ নয়; বাউল সাধনা, লোকজ সংগীত, মৌখিক ঐতিহ্য এবং ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির সঙ্গে তাঁর উত্তরাধিকার গভীরভাবে যুক্ত। এই ঐতিহ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ, গবেষণা এবং শিল্পীদের প্রতি যথাযথ সম্মান।

বাউলশিল্পীদের জীবনমান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের শিল্প ও সাধনাকে শুধু উৎসবের আকর্ষণ হিসেবে দেখা হলে চলবে না। যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালনের গান ও বাউল ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি ছেঁউড়িয়ার পরিবেশ, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আখড়াকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

লালনের দর্শনের নামে কোনো সংকীর্ণ ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করার চেষ্টাও পরিহার করা জরুরি। তাঁর গান ও সাধনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সম্মান জানিয়ে মুক্ত, অনুসন্ধিৎসু ও যুক্তিনির্ভর আলোচনা উৎসাহিত করতে হবে। কারণ লালনের মানবতাবাদী উত্তরাধিকারের অন্যতম শক্তি হলো মানুষের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। 

মানুষই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিন দিনের আয়োজন শেষ হয়েছে। মেলার দোকানগুলো একসময় গুটিয়ে যাবে, দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ গন্তব্যে, আখড়াবাড়ির উৎসবমুখর পরিবেশও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। কিন্তু এবারের আয়োজন থেকে উঠে আসা মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান যেন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে না যায়।

লালন আমাদের সামনে এমন এক মানবিক সমাজের স্বপ্ন তুলে ধরেন, যেখানে মানুষের পরিচয়কে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না; যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না; যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা নয়, সহাবস্থানের বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতির জগৎ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, লালনের দর্শন কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রচিত বক্তব্য নয়, আবার তা কেবল আবেগঘন সংগীতের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মর্যাদা নিয়ে যত দিন প্রশ্ন থাকবে, বৈষম্য ও বিভাজনের বিরুদ্ধে যত দিন সংগ্রাম চলবে, তত দিন তাঁর দর্শন নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

তাই লালনের তিরোধান দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য খুঁজতে হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে—অন্যের প্রতি আচরণে, সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে, শিক্ষার চর্চায় এবং রাষ্ট্রীয় নীতির বাস্তবায়নে। লালনকে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো তাঁর মানবিক বোধকে নিজের মধ্যে ধারণ করা এবং অন্যের মধ্যেও সেই বোধ জাগিয়ে তোলা।

ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি থেকে তাই আজ যে আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে, তা কেবল বাউল সাধক কিংবা লালনভক্তদের জন্য নয়; তা সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য। আসুন, আমরা লালনকে শুধু গানে, মেলায় কিংবা স্মরণানুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর মানবতাবাদী দর্শনকে জীবনের অংশ করে তুলি। ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও মতের ভিন্নতা অতিক্রম করে মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠা করি। কারণ লালনের দর্শনের প্রকৃত শক্তি বিভাজনে নয়, মিলনে; ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়; সংকীর্ণতায় নয়, মুক্ত মানবিকতায়।

আরও পড়ুন