EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

৫৮ সন্তানের বাবা, সবার নামও মনে রাখতে পারেন না সাদিক

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫ এএম

৫৮ সন্তানের বাবা, সবার নামও মনে রাখতে পারেন না সাদিক

ছবি: বিবিসি বাংলা

অ অ

আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিক। চার স্ত্রীর ঘরে তাঁর ৫৮ সন্তান। সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের জন্ম হয়েছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে। এত বড় পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগানো, পোশাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের প্রয়োজন মেটাতে প্রতিদিনই লড়াই করতে হয় ৫৭ বছর বয়সী এই বাবাকে। কখনো কখনো অভাবের কারণে তাঁর কয়েক সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।

আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং অনেক সন্তানের বাবা-মা হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে সাদিকের পরিবার দেশটির অন্যতম বড় পরিবার বলে ধারণা করা হয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা এত বেশি যে মাঝেমধ্যে নিজের সব সন্তানের নামও মনে করতে পারেন না তিনি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সন্তানদের গুনে দেখেন, সবাই বাড়িতে আছে কি না।

সাদিক বলেন, তাঁর প্রতিদিনের সব চেষ্টা ঘিরে থাকে সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সীমিত আয় দিয়ে এত বড় পরিবারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। ফলে পরিবারের ছোট সদস্যদেরও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বড় হতে হচ্ছে।

এই পরিবারের চার নারীও বছরের পর বছর ধরে গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সাদিকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় তাঁর চার স্ত্রীর বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

বাড়িতে যেন উৎসবের আবহ

সাদিকের ছোট সন্তানরা যখন তাঁকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন বাড়িটি কোলাহল, হাসি আর ব্যস্ততায় ভরে ওঠে। তাঁর ভাষায়, সেই দৃশ্য দেখে মনে হয় যেন বাড়িতে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।

তবে এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে গভীর আর্থিক সংকট। পরিবারের সদস্যদের জন্য দিনে মাত্র দুবার—সকালে ও সন্ধ্যায়—রান্না হয়। দুই নারী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে প্রতিদিনই নানা হিসাব মেলাতে হয় পরিবারটিকে।

সাদিক বলেন, আরও সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ‘নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো’।

সন্তানদের নাম মনে রাখতে না পারার অভিজ্ঞতা নিয়ে হাসতে হাসতে তিনি বলেন, অনেক সময় সবাইকে আলাদা করে নাম ধরে ডাকতে পারেন না। তাই অধিকাংশ সন্তানকেই ‘বাবা’ বা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন।

নিজের এক মেয়ের বিয়ের সময়ের একটি ঘটনা স্মরণ করে সাদিক বলেন, বিয়ে পড়ানোর সময় মৌলভি সাহেব তাঁর মেয়ের নাম জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর ভুল করে অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলেন।

সাদিকের ভাষায়, ‘যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।’  

এত বেশি সন্তান থাকার কারণে মাঝেমধ্যে পরিবারের কোনো সদস্যের অনুপস্থিতিও সহজে বুঝতে পারেন না তিনি। এক রাতে সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসার পর সন্তানদের গুনতে গিয়ে একজনকে পাননি সাদিক। কিন্তু অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে, সেটিও তাঁর জানা ছিল না।

ঘটনাটি বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলের চারপাশে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এটাও জানতাম না যে অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তাঁর সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাতটা সেখানে কাটাবে।’

অল্প বয়সে বিয়ে, বড় দায়িত্ব

সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল তাঁর ২০ বছর বয়সে। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রতিটি বিয়ের জন্য কনের পরিবারকে দেওয়ার অর্থ জোগাড় করতে তাঁকে কয়েক বছর ধরে সঞ্চয় করতে হয়েছে।

তাঁর স্ত্রীদের বয়স বিয়ের সময় খুব কম ছিল। ফলে শৈশব ও কৈশোরেই তাঁদের সংসার, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান লালন-পালনের মতো বড় দায়িত্ব নিতে হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে এই দায়িত্ব তাঁদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

এত বড় পরিবার নিয়ে চলার পাশাপাশি সাদিক ও তাঁর স্ত্রীরা আরও একটি গভীর বেদনার মধ্য দিয়ে গেছেন। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা ১৪ সন্তানকে হারিয়েছেন। সন্তান হারানোর এই অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনে বড় শোকের কারণ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ মা এবং অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। বারবার গর্ভধারণের কারণেও নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দিতে পারে। 

আফগানিস্তানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুঝুঁকি এখনো উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা সীমিত থাকায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই

সাদিকের পরিবারের জীবনে আর্থিক সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। পরিবারের সদস্যরা শীতকালে ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাবার খান। গ্রীষ্মকালে তাঁদের খাবার খাওয়ার জায়গা হয় উঠান। তবে মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

পরিবারটির গোসলের জায়গাটি কাপড় ও বাসন ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা হয়। একই জায়গা শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন করতে হয় নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে।

শীতকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, নেই মজবুত দরজাও। প্রবেশমুখে শুধু পাতলা পর্দা ঝোলানো থাকে। ফলে ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য পরিবারের সদস্যদের খুব একটা সুরক্ষিত ব্যবস্থা নেই।

কখনো কখনো ছয়-সাতজনকে একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমাতে হয়। সাধারণ গদি ছাড়া তাঁদের ঘুমানোর জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থাও নেই। শীতের রাতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।

জ্বালানি কেনার সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় পরিবারটি কাগজ ও হাতের কাছে পাওয়া অন্যান্য উপকরণ পুড়িয়ে আগুন জ্বালায়। অন্যদিকে, পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে শুধু সাদিক নন, তাঁর অনেক সন্তানও কাজ করে। তারা কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে। এসব উপকরণ কখনো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আবার কখনো বিক্রি করে পরিবারের খরচ মেটানো হয়।

সাদিক নিজেও একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তবে তাঁর আয় পরিবারের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তিনি জানান, প্রতিটি গাড়ি বিক্রির জন্য মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান। এত বড় পরিবারের খাবার, পোশাক, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে এই অর্থ যথেষ্ট নয়।

সন্তানদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতেও তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বলে জানান তিনি। কিন্তু সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

এভাবে প্রতিদিনই খাবার, আশ্রয় ও সন্তানদের অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে সংগ্রাম করতে হয় পরিবারটিকে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা যত বেশি, তাঁদের চাহিদাও তত বেশি। কিন্তু সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আয় বাড়ানোর সুযোগ নেই সাদিকের।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। তাঁর আশা, সহায়তা পেলে সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং তাদের জন্য কিছুটা ভালো জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সাদিকের জীবনের দুই স্বপ্ন

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন সাদিক। নিজের জীবনে পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও তিনি চান, তাঁর সন্তানেরা শিক্ষা লাভ করুক। তারা যেন ধর্ম ও পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারে, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

তবে তাঁর কাছে শিক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চিন্তা সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করা। প্রতিদিনের আর্থিক সংকটের কারণে কখনো কখনো সন্তানদের ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়। তাই তাদের পেট ভরে খাওয়াতে পারাই তাঁর অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা।

নিজের জীবনের ইচ্ছার কথা বলতে গিয়ে সাদিক বলেন, তাঁর মাত্র দুটি বড় স্বপ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।’

৫৮ সন্তানের এই বাবা প্রতিদিন যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষা ও খাবারের নিশ্চয়তাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। বিশাল পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের সন্তানদের নাম মনে রাখাও যেখানে কখনো কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে তাদের সবার জন্য খাবার ও শিক্ষার ব্যবস্থা করাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আরও পড়ুন