জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে উত্তাল ইউরোপ, বাড়ছে কট্টর ডানপন্থীদের জনপ্রিয়তা
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাড়ছে জনঅসন্তোষ। ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী বছরের নির্বাচন সামনে রেখে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর প্রতি জনসমর্থন বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে দলগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এ সংঘাতের কারণে বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন ঘটায় ইউরোপের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছে। গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে, আর ডিজেলের দাম হয়েছে দ্বিগুণ।
জ্বালানির বাড়তি দাম, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে ইউরোপজুড়ে অসন্তোষ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং সরকারি ব্যয় কমানোর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশগুলোর সরকারকে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন। তবে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে বিক্ষোভকারীদের দাবির সঙ্গে এক করে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ফ্রান্সে প্যারিসের উত্তর উপকণ্ঠে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবনতিশীল অবকাঠামো নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে বড় ধরনের অস্থিরতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন স্থানে দোকান লুট ও ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরে ১৯ শতকের একটি পৌর ভবনেও আগুন দেওয়া হয়।
ইতালির মিলান শহরেও সরকারি সেবার মান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পাশাপাশি কয়েকটি দোকান লুটের ঘটনা ঘটে।
দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্র চালানোর ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাকচালক, কৃষক ও ইস্পাতশ্রমিকদের সড়ক অবরোধে দক্ষিণ ইতালির কয়েকটি এলাকায় পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও জ্বালানির ঘাটতি এবং সুপারশপে পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) কম মজুরি, বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন। স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী এক নারীকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটিতে আগামী মাসে আগাম নির্বাচন হওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। আর আলবেনিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গিলস ইভালদির মতে, ইউরোপজুড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ এখন জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে নির্বাচনের বড় ইস্যু জ্বালানির দাম
ফ্রান্সে আগামী বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। বাজেট ঘাটতি ও ঋণবাজারের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার।
কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন ল্য পেন এবং বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশো—দুজনই নির্বাচনী প্রচারে জ্বালানির দাম কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। ল্য পেন জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর এ প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্রাম ও আধা-শহরাঞ্চলে গাড়ির ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে জ্বালানির দাম বড় উদ্বেগের বিষয়। ফলে এ ইস্যু ল্য পেনের সমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। জরিপ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর ল্য পেনের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে মাখোঁর জনপ্রিয়তা।
রাশিয়ার জ্বালানি কেনার দাবি জোরালো হচ্ছে
জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফলের পর দলটির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। চলতি মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, টানা পঞ্চম বছরের মতো জীবনযাত্রার ব্যয় জার্মানদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। সেপ্টেম্বরে দেশটির মূল্যস্ফীতি প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। একই সময়ে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
এএফডি রাশিয়ার সঙ্গে আবার জ্বালানি বাণিজ্য চালুর দাবি জানাচ্ছে। দলটির যুক্তি, ইউক্রেনকে সমর্থন দিতে গিয়ে জার্মানি নিজের অর্থনীতি ও জ্বালানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করছে।
মিউনিখের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ান স্টেকেল বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং এএফডির প্রতি ভোটারদের সমর্থন বৃদ্ধির মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেছে। তাঁর মতে, জনতুষ্টিবাদী দলগুলো জ্বালানির বাড়তি ব্যয়কে সরকারের নীতির ফল হিসেবে তুলে ধরে। তবে এর পেছনে থাকা আন্তর্জাতিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করা তুলনামূলক কঠিন।
ইতালিতেও প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন নতুন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফিউচার। দলটি রাশিয়ার সঙ্গে আবার গ্যাস বাণিজ্য চালুর পক্ষে।
পোল্যান্ডেও জ্বালানির বিল নিয়ে উদ্বেগের কারণে কট্টর ডানপন্থী দল কনফেডারেশন অব দ্য পলিশ ক্রাউনের সমর্থন বাড়ছে। দলটির নেতা গ্রজেগর্জ ব্রাউন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস কেনা আবার শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মানিতে রাশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের অবতরণস্থল লুবমিনে এএফডির রাজনীতিকদের সঙ্গে একই অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ইউরোপের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী বছরের নির্বাচনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স