দেশে হার্ট অ্যাটাক-স্ট্রোকসহ অকাল মৃত্যুর পাঁচ কারণ
ডেইলি সান রিপোর্ট, স্বাস্থ্য
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অকালমৃত্যুর বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে অসংক্রামক রোগ। হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কম বয়সীরাও। অনেক ক্ষেত্রে এসব রোগের লক্ষণ শুরুতে স্পষ্ট না হওয়ায় রোগ শনাক্ত করতে দেরি হয়। ফলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে হয়। এসব মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি অকালমৃত্যু। ডব্লিউএইচওর হিসাবে, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ—এই চার ধরনের অসংক্রামক রোগ বিশ্বজুড়েই অকালমৃত্যুর বড় কারণ।
বাংলাদেশে ২০২১ সালের মৃত্যুর হিসাবেও স্ট্রোক ও ইস্কেমিক হৃদ্রোগ শীর্ষস্থানীয় কারণগুলোর মধ্যে ছিল। একই তালিকায় ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) ও ডায়াবেটিসও রয়েছে।
১. হার্ট অ্যাটাক ও হৃদ্রোগ
অকালমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হৃদ্রোগ। হৃদ্রোগের বিভিন্ন ধরনের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বা হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হওয়া একটি গুরুতর জরুরি অবস্থা। বাংলাদেশে ইস্কেমিক হৃদ্রোগ মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে।
হার্ট অ্যাটাক হলে বুকের মাঝখানে চাপ, ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। এ ব্যথা শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ব্যথা হতে পারে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব বা বমিও হতে পারে।
তবে সবার ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ একই রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে বুকের ব্যথা খুব বেশি নাও হতে পারে। আবার কারও ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট বা বদহজমের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে। তাই এসব লক্ষণকে সাধারণ সমস্যা মনে করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও বায়ুদূষণের মতো বিষয় হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডব্লিউএইচও বলছে, তামাক ব্যবহার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও বায়ুদূষণসহ কয়েকটি সাধারণ ঝুঁকি কমানো গেলে অসংক্রামক রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।
২. স্ট্রোক
বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে স্ট্রোক অন্যতম। ডব্লিউএইচওর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৮০ জন।
মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে। এটি বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও কম বয়সীদেরও এ রোগ হতে পারে।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে হঠাৎ শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা বুঝতে সমস্যা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ছাড়া হঠাৎ চোখে ঝাপসা দেখা, হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা, তীব্র মাথাব্যথা, গিলতে সমস্যা, বমি বা খিঁচুনিও হতে পারে।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকে।
৩. ডায়াবেটিস
ডায়াবেটিস এখন শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কম বয়সীদের মধ্যেও এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। অনেক মানুষ শরীরে ডায়াবেটিস থাকা সত্ত্বেও তা জানেন না। ফলে দীর্ঘদিন রোগটি অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকতে পারে।
ডায়াবেটিস সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ, চোখের সমস্যা, স্নায়ুর ক্ষতি ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা এবং ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২১ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিসে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১৯ জন। একই সময়ে স্ট্রোক ও ইস্কেমিক হৃদ্রোগের মৃত্যুহার ছিল আরও বেশি।
৪. দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ
অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির মতো দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগও অকালমৃত্যুর কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে সিওপিডি মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। ২০২১ সালের ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে এ রোগে মৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৩১ জন।
দীর্ঘদিনের কাশি, কফ, শ্বাসকষ্ট, বুক চাপ লাগা কিংবা সামান্য হাঁটা বা পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকেই এসব সমস্যা দীর্ঘদিন সহ্য করেন এবং চিকিৎসকের কাছে যান না। এতে রোগ ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ধূমপান দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগের বড় ঝুঁকি। এর পাশাপাশি বায়ুদূষণ ও ঘরের ভেতরের ধোঁয়ার সংস্পর্শও শ্বাসতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ডব্লিউএইচও বলছে, ঘরের বায়ুদূষণের সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, সিওপিডি ও ফুসফুসের ক্যানসারের মতো রোগে অকালমৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।
৫. ক্যানসার
অকালমৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ ক্যানসার। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যানসার হতে পারে এবং এর ধরন অনুযায়ী লক্ষণও ভিন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে রোগ শনাক্ত হতে দেরি হয়।
শরীরে অস্বাভাবিক কোনো গুটি, দীর্ঘদিনের কাশি, অস্বাভাবিক রক্তপাত, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, খাবার গিলতে সমস্যা, দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা বা কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউএইচও বলছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
শুধু বয়স্কদের নয়, ঝুঁকিতে কম বয়সীরাও
অসংক্রামক রোগকে অনেক সময় বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব রোগ যেকোনো বয়সে হতে পারে। ডব্লিউএইচও বলছে, হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বয়সের সঙ্গে বাড়লেও এসব রোগের ঝুঁকির কারণগুলো কম বয়স থেকেই মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনাও উদ্বেগের বিষয়। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এ চার ধরনের রোগের কারণে ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা ছিল ১৯ দশমিক ২ শতাংশ।
অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে যা জরুরি
অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং রোগ দ্রুত শনাক্ত করা। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। পরিবারে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ইতিহাস থাকলে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বুকে তীব্র ব্যথা, হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, গুরুতর শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো জরুরি উপসর্গ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসা নেওয়ার ওপর নির্ভর না করে রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। কারণ অসংক্রামক রোগের একটি বড় অংশের ঝুঁকি জীবনযাপন ও পরিবেশগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এসব ঝুঁকি কমানো গেলে অকালমৃত্যু অনেকটাই প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।
সূত্র: বিবিসি বাংলা






