নাটক থেকে রাজনীতির হাতেখড়ি, ছাত্র আন্দোলনের মুখ কে এই নেহা বোরা?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএম
ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। ছবি: সংগৃহীত
নাটকের মঞ্চ থেকে রাজনীতির সঙ্গে পরিচয়, এরপর ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা। ভারতের তরুণ ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার পথচলা এভাবেই এগিয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো বিষয় নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি আলোচনায় এসেছেন। আন্দোলনে অংশ নিয়ে আটক হওয়া, হুমকির মুখে পড়া এবং দীর্ঘ সময় অনশন করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভানেত্রী নেহা বিভিন্ন সময়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। কখনও পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে, কখনও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিলের দাবিতে তাঁকে আন্দোলনে দেখা গেছে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতেও প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন তিনি।
নিট আন্দোলনে জাতীয় পরিচিতি
২০২৬ সালে ভারতের জাতীয় যোগ্যতা নির্ধারণী প্রবেশিকা পরীক্ষা—নিট (এনইইটি-ইউজি) নিয়ে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান নেহা। পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অনিয়মের দায় স্বীকার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা আন্দোলন করেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা এই আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল নেহার ২৩ দিনের অনশন। সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে তিনি এই অনশনে অংশ নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় অনশনের কারণে একপর্যায়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
নিট পরীক্ষাকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ তাঁকে আরও পরিচিত করে তোলে। পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
দিল্লিতে বিক্ষোভ, আটক নেহা
গত ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) বাতিল এবং ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘিরে আবারও আলোচনায় আসেন নেহা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ওই কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা দিল্লিতে যান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পুলিশ আটক করে। এরপর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন নেহা ও তাঁর সহযোগীরা।
দুপুরের দিকে তাঁরা মিছিল নিয়ে বের হলে যন্তর মন্তরে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তার কারণে বিক্ষোভস্থল পরিবর্তন করা হয়। পরে দিল্লি হাট এলাকায় কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মিছিলের মাঝপথে নেহাকে আটক করে পুলিশ ও একটি বাসে তুলে দেয়। এ সময় বাস ঘিরে বিক্ষোভ দেখান আন্দোলনকারীরা।
এর আগেও বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়ে আটক হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে নেহার। আন্দোলনের সময় তাঁর গায়ে কালি ছোড়া এবং প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এখানে পাওয়া যায়নি।
পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা, বামপন্থী চিন্তার সঙ্গে পরিচয়
নেহা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় জীবনের একটি সময় তিনি পশ্চিমবঙ্গে কাটান। শিলিগুড়িতে মাধ্যমিক, একাদশ শ্রেণি ও উচ্চমাধ্যমিকের পড়াশোনা করেন তিনি।
পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নেহা। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকসে পিএইচডি করছেন।
বাংলায় থাকার সময়ই বামপন্থী রাজনীতি, সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় গভীর হয় বলে জানিয়েছেন নেহা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে না এলে চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা ও অরুন্ধতী রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব ও লেখকদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়তো এভাবে গড়ে উঠত না।
নেহার মতে, বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ তাঁকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতি থেকে দূরত্ব তৈরি করতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভিন্নভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
নাটক থেকে রাজনীতির হাতেখড়ি
নেহার রাজনৈতিক যাত্রায় নাটকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, নাটকের মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতিকে নতুনভাবে বুঝতে শেখেন। রাজনীতি শুধু নির্বাচন, রাজনৈতিক দল কিংবা ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব রয়েছে—নাটকের অভিজ্ঞতা থেকে এই উপলব্ধি তৈরি হয় তাঁর।
শিক্ষার সুযোগ কারা পাবেন, কারা কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হবেন, মানুষের মর্যাদা কীভাবে রক্ষা করা হবে এবং ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করার অধিকার কতটা থাকবে—এসব বিষয়কেও রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখেন নেহা।
এই চিন্তা থেকেই ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে এসে শিক্ষা, অধিকার ও সরকারি সিদ্ধান্তের জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন।
উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মুক্তির পক্ষে
ভারতের রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার নিয়েও সরব হয়েছেন নেহা। ২০২০ সালের দিল্লির সহিংসতার ঘটনায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন—ইউএপিএর অধীনে আটক উমর খালিদের মুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানান, তিনি এবং এআইএসএ উমর খালিদের মুক্তিকে সমর্থন করেন।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-বিরোধী আন্দোলনের সময় সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ইউএপিএর অধীনে আটক শারজিল ইমামের মুক্তির পক্ষেও বক্তব্য দিয়েছেন নেহা। এসব অবস্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের সীমা নিয়ে চলা বিতর্কে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল নিয়ে তাঁর মত
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন নেহা। তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসার ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক হতাশার পরিণতি হিসেবে দেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর মতে, তৃণমূলের শাসনামলে মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক হতাশা তৈরি হয়েছিল, তার সুযোগেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাঁর এই বক্তব্য রাজ্যটির রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন তুলে ধরে।
তরুণদের আন্দোলনের পরিচিত মুখ
নেহা বোরার পরিচিতি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে তরুণদের অসন্তোষকে আন্দোলনের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানে বামপন্থী আদর্শের প্রভাব স্পষ্ট। ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্তের সমালোচনা, শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়া এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নাটকের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক চিন্তা তাঁকে ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে নিয়ে এসেছে। এখন শিক্ষা, অধিকার ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্নে ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে পরিচিত মুখ নেহা বোরা। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা দেশটির তরুণদের প্রতিবাদী ভূমিকা ও ছাত্র আন্দোলনের পরিসর নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।


-6ac8522244b23.jpg)

-6ac3405742985.jpg)

-6ac8774ea7663.jpg)