শান্ত নীল জলরাশি। হঠাৎ বাতাস থমকে যায়। চারপাশের পরিবেশ কেমন এক রহস্যময় নিস্তব্ধতায় ঢাকা পড়ে। কিন্তু সমুদ্রের তলদেশে তখন চলে ভয়াবহ এক রূপান্তরের প্রস্তুতি। নিঃশব্দে জন্ম নেয় প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় খলনায়ক সমুদ্রের উত্তপ্ত পানি। যখন সাগরের পানির তাপমাত্রা অন্তত ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তখন এই খেলা শুরু হয়।
বিশাল জলরাশি থেকে বাষ্প হয়ে গরম বাতাস হু হু করে ওপরে উঠে যায়। ফলে নিচের স্তরে তৈরি হয় এক গভীর শূন্যতা। আর সেই ফাঁকা জায়গা দখল করতে চারপাশ থেকে পাগলের মতো ছুটে আসে ঠাণ্ডা বাতাস।
কিন্তু বাতাস শুধু সোজা পথে আসে না। পৃথিবীর নিজ অক্ষের ঘূর্ণনের ধাক্কায় চারপাশের বাতাস চাকতির মতো ঘুরতে শুরু করে। তৈরি হয় বিশাল ঘূর্ণিপাক। মেঘের আড়ালে ধাপে ধাপে রূপ নেয় এক দানব—ঘূর্ণিঝড়।
সব ঝড় কি সমান ভয়ঙ্কর?
সব ঘূর্ণিঝড় একই শক্তি নিয়ে উপকূলে আঘাত হানে না। বিজ্ঞানের ভাষায় সাগরের এই তাণ্ডবকে ১ থেকে ৫টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। পরিমাপের এই স্কেলের নাম ‘সাফির-সিম্পসন স্কেল’। বাতাসের গতিবেগের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় ঝড়ের শক্তিমত্তা।
ক্যাটাগরি-১ (ঘণ্টায় ১১৯-১৫৩ কিমি): ঝড়ের সূচনা বলা চলে। এতে কাঁচা ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়, গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে।
ক্যাটাগরি-২ (ঘণ্টায় ১৫৪-১৭৭ কিমি): শক্তি আরেক ধাপ বাড়ে। দুর্বল বাড়িঘরের ছাদ বা চাল উড়ে যায়, উপড়ে পড়ে বড় গাছ।
ক্যাটাগরি-৩ (ঘণ্টায় ১৭৮-২০৮ কিমি): বড় ধরনের বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে আসে। পাকা দালানের ক্ষতি শুরু হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ক্যাটাগরি-৪ (ঘণ্টায় ২০৯-২৫১ কিমি): উপকূলকে এক নিমেষে লণ্ডভণ্ড করে দেওয়ার শক্তি রাখে। মাইলের পর মাইল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সর্বগ্রাসী দানব ক্যাটাগরি-৫
তবে সব সীমানা ছাড়িয়ে যায় যখন ঝড় রূপ নেয় 'ক্যাটাগরি-৫'-এ। এটিই আন্তর্জাতিক স্কেলে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক এবং প্রাণঘাতী রূপ।

ঘণ্টায় ২৫২ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি গতিবেগের বাতাস নিয়ে যখন ক্যাটাগরি-৫ ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আছড়ে পড়ে, তখন সত্যি প্রলয় নেমে আসে। গাছ উপড়ে যাওয়া বা টিনের চাল উড়ে যাওয়া তো খুবই সামান্য বিষয়। বড় বড় দালানকোঠা তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যায় এই বাতাসের ধাক্কায়।
বাতাসের সাথে যোগ হয় প্রকাণ্ড জলোচ্ছ্বাস। সাগরের উত্তাল ঢেউ বাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। মুহূর্তে ভেসে যায় গ্রাম, শহর, ধানক্ষেত। মাইলের পর মাইল এলাকা তলিয়ে যায় নোনা পানিতে।
স্মৃতির পাতায় সিডরের বিভীষিকা
বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ক্যাটাগরি-৫ ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর। সেই কালরাতে বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছিল এক বিভীষিকাময় রূপের। তার নাম ছিল ‘সিডর’।
তবে সাগরে থাকা অবস্থায় ঘূর্ণিঝড়টি সর্বোচ্চ ক্যাটাগরি-৫ এর শক্তি অর্জন করলেও উপকূলে আঘাত হানার সময় এটি ক্যাটাগরি-৪ স্তরে নেমে এসেছিল।
সাগরের বুকে রূপ নেওয়া সেই মহাশত্রুর বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার। আর উপকূলে আঘাত হানার সময় এর বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২৩-২২৫ কিলোমিটার। মাত্র কয়েক ঘণ্টার তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গিয়েছিল বিস্তীর্ণ উপকূল। নদী আর সাগরের জল জলোচ্ছ্বাস হয়ে গ্রাস করেছিল হাজারও প্রাণ।
প্রকৃতির নিয়মেই সাগরের বুকে বারবার গরম বাতাস ওপরে উঠবে। তৈরি হবে শূন্যতা, জন্ম নেবে নতুন কোনো ঘূর্ণি। তাই এটি সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব নয়। তবে আবহাওয়ার সতর্কতা, পূর্ভাবাস মেনে চলে আমরা এই দুর্যোগ থেকে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি।


-6aa5519ba549f.jpg)