EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

চাঁদ না থাকলে পৃথিবীতে কী ঘটবে?

আল-আমিন বিন আলী

আল-আমিন বিন আলী

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৮ এএম

চাঁদ না থাকলে পৃথিবীতে কী ঘটবে?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

রাতের আকাশে আলো ছড়ানো চাঁদ আমাদের চেনা পৃথিবীর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাবুন তো একবার, যদি হঠাৎ চাঁদ গায়েব হয়ে যায় তাহলে কেমন হবে পৃথিবী, তখন কী ঘটবে? জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের অনুপস্থিতি পৃথিবীর জলবায়ু, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা এমনকি জীবনের অস্তিত্বকেই চরম সংকটে ফেলে দেবে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, আমাদের এই নীল গ্রহের বর্তমান রূপ ধরে রাখতে চাঁদের অবদান অপরিসীম। চাঁদ ছাড়া পৃথিবী আর আগের মতো শান্ত ও বসবাসের যোগ্য থাকবে না। বদলে যাবে এর আবর্তন গতি, আবহাওয়া এবং চিরচেনা ঋতুচক্র।

বন্ধ হবে উত্তাল জোয়ার-ভাটা

পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার মূল কারণ হলো চাঁদের মহাকর্ষ বল। চাঁদ যদি না থাকে, তবে সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা একবারে বন্ধ হয়ে যাবে না, তবে তা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বে। সূর্য তখন একা কিছুটা টান সৃষ্টি করবে। ফলে বর্তমানে যে শক্তিশালী জোয়ার-ভাটা আমরা দেখি, তা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যাবে।

সমুদ্রের স্রোত দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে উপকূলীয় পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা বহু সামুদ্রিক প্রাণী বিলুপ্তির মুখে পড়বে। সমুদ্রের পানির পুষ্টি উপাদান ছড়ানো বন্ধ হলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

দিন হবে মাত্র ৬ ঘণ্টার

বর্তমানে পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর একবার ঘুরে আসতে ২৪ ঘণ্টা সময় নেয়। এই গতি নিয়ন্ত্রণে চাঁদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। চাঁদের মহাকর্ষীয় টানের ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি ধীরে ধীরে ধীরগতির হয়েছে।

চাঁদ না থাকলে পৃথিবী অনেক দ্রুত ঘুরতে শুরু করবে। তখন এক একটি দিন ২৪ ঘণ্টার বদলে মাত্র ৬ ঘণ্টার হতে পারে। বাকি ১৮ ঘণ্টা ছেয়ে থাকবে নিকষ কালো রাত। একটি পুরো বছরে ৩৬৫ দিনের জায়গায় দিনের সংখ্যা দাঁড়িয়ে যাবে ১ হাজার থেকে ১৫০০টিতে। দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে আবহাওয়ায় দেখা দেবে মারাত্মক বিপর্যয়। পৃথিবীতে অনবরত ঘণ্টায় শত শত কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসবে প্রচণ্ড ঝড় ও ঘূর্ণিঝড়।

অক্ষপথের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরম আবহাওয়া

পৃথিবী তার অক্ষের ওপর সাড়ে ২৩ ডিগ্রি কোণে হেলে ঘুরে থাকে। এই হেলে থাকার কারণেই পৃথিবীতে সুন্দর ঋতু পরিবর্তন হয়। চাঁদ তার মহাকর্ষ বল দিয়ে পৃথিবীর এই কোণকে বছরের পর বছর স্থির রেখেছে।

চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর এই ভারসাম্য বজায় থাকবে না। পৃথিবী তার অক্ষপথ থেকে মারাত্মকভাবে দুলতে শুরু করবে। কখনো এটি একদম সোজা হয়ে যাবে, আবার কখনো ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত হেলে পড়বে। এর ফলে উত্তর মেরু বা দক্ষিণ মেরু সরাসরি সূর্যের দিকে মুখ করে থাকবে। পৃথিবীর আবহাওয়ায় দেখা দেবে তীব্র বিশৃঙ্খলা। এক অঞ্চলে চরম দাবদাহ ও অন্য অঞ্চলে মারাত্মক শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেবে। নিয়মিত ঋতু পরিবর্তনের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট থাকবে না।

অন্ধকার রাত ও প্রাণিজগতের বিনাশ

চাঁদ না থাকলে রাতের আকাশ হয়ে উঠবে প্রচণ্ড অন্ধকার। পূর্ণিমার যে আলো আমরা পাই, তা আর থাকবে না। শুধু দূরবর্তী তারাগুলোর সামান্য আলোই রাতের ভরসা হবে।

এই চরম অন্ধকার বহু নিশাচর প্রাণীর শিকার ও বেঁচে থাকার অভ্যাসে বাধা সৃষ্টি করবে। সামুদ্রিক কচ্ছপ, যারা চাঁদের আলো দেখে সাগরে ফিরে যায়, তারা দিক হারিয়ে ফেলবে। এছাড়া যেসব পশুপাখি বা পতঙ্গ চাঁদের আলো ও জোয়ার-ভাটার হিসাব ধরে প্রজনন করে, তাদের বংশবৃদ্ধি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। বহু প্রজাতির প্রাণী পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে।

আকাশের সুরক্ষা বলয় ধ্বংস

চাঁদ পৃথিবীর জন্য একটি প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করে। মহাশূন্যে ভেসে থাকা হাজার হাজার উল্কাপাত ও গ্রহাণুর আঘাত থেকে চাঁদ বহুবার পৃথিবীকে রক্ষা করেছে। চাঁদের গায়ে যেসব বিশাল গর্ত আমরা দেখি, তা বিভিন্ন সময়ে হওয়া উল্কাপাতের প্রমাণ।

চাঁদ না থাকলে মহাশূন্যের এসব পাথরখণ্ড সরাসরি এসে আছড়ে পড়বে পৃথিবীর বুকে। এতে পৃথিবীর ভূখণ্ড ও জীবজগৎ বারবার ধ্বংসাত্মক বিপদের মুখোমুখি হবে।

মানবজাতির ভবিষ্যৎ কী হবে

চাঁদ রাতারাতি গায়েব হয়ে গেলে মানবসভ্যতা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। দিন ছোট হয়ে যাওয়া, তীব্র ঝড়, আর আবহাওয়ার অনিয়ম মানবজীবনকে স্তব্ধ করে দেবে। কৃষিকাজ ব্যাহত হবে, উপকূলীয় শহরগুলো সমুদ্রের পানির পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চাঁদ শুধু আমাদের রাতের আকাশ সুন্দর করে না, বরং পৃথিবীর প্রতিটি কোণে জীবনের ছন্দ বজায় রাখে। চাঁদ ছাড়া পৃথিবী হবে একটি শীতল, অশান্ত ও বাস অযোগ্য গ্রহ। তাই চাঁদের উপস্থিতি আমাদের এই গ্রহকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

আরও পড়ুন