EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

এক পাথরেই আলোকিত আবার ধ্বংসও করা যায় বড় শহর, ইউরেনিয়ামের শক্তির গল্প

আল-আমিন বিন আলী

আল-আমিন বিন আলী

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৬ পিএম

এক পাথরেই আলোকিত আবার ধ্বংসও করা যায় বড় শহর, ইউরেনিয়ামের শক্তির গল্প

ইউরেনিয়াম/ ছবি সংগৃহীত

অ অ

দেখতে অনেকটা হুবহু সাধারণ পাথরের মতো, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অকল্পনীয় শক্তি। বলা হচ্ছে ইউরেনিয়ামের কথা। অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে দীর্ঘ সময় বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আবার এই একই মৌল ব্যবহার করা যায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞেও।

প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই ভারী ও তেজস্ক্রিয় ধাতুর নাম শোনেননি- এমন মানুষ খুব কম। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ইউরেনিয়ামের গুরুত্বও অনেক।

ইউরেনিয়াম পর্যায় সারণির ৯২ নম্বর মৌল। এটি রূপালি-সাদা রঙের ভারী ধাতু। লোহার তুলনায় এর ঘনত্ব অনেক বেশি। সাধারণত খনি থেকে আকরিক হিসেবে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করা হয়। পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তা ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

ইউরেনিয়াম/ ছবি সংগৃহীত

তেজস্ক্রিয়তার কারণে ইউরেনিয়ামের পরমাণু স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয় হতে থাকে। এ সময় তা অন্য মৌল ও কণিকায় রূপান্তরিত হয়। তবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর পরমাণুর নিউক্লিয়াস বিভাজিত হয়ে বিপুল শক্তি ছাড়তে পারে।

যেভাবে আবিষ্কার

১৭৮৯ সালে জার্মান রসায়নবিদ মার্টিন হাইনরিখ ক্লাপ্রোথ পিচব্লেন্ড নামের একটি আকরিক পরীক্ষা করতে গিয়ে নতুন মৌলের অস্তিত্ব শনাক্ত করেন। তখন নতুন আবিষ্কৃত ইউরেনাস গ্রহকে ঘিরে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই গ্রহের নাম অনুসারেই ক্লাপ্রোথ নতুন মৌলটির নাম দেন ইউরেনিয়াম।

ইউরেনিয়াম/ ছবি সংগৃহীত

তবে ক্লাপ্রোথ যে পদার্থ আলাদা করেছিলেন, সেটি ছিল ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড। প্রায় পাঁচ দশক পর, ১৮৪১ সালে ফরাসি রসায়নবিদ ইউজিন-মেলকিওর পেলিজট প্রথমবারের মতো বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম ধাতু আলাদা করতে সক্ষম হন।

তেজস্ক্রিয়তার সন্ধান

ইউরেনিয়ামের আসল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে আরও কয়েক দশক সময় লাগে।

১৮৯৬ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী হেনরি বেকেরেল ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার করেন। তিনি দেখতে পান, আলো ছাড়াও ইউরেনিয়াম থেকে এক ধরনের অদৃশ্য রশ্মি বের হয়। সেই রশ্মি ফটোগ্রাফিক প্লেটেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। পরে মেরি কুরি ও পিয়েরে কুরি তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গভীর গবেষণা করেন। তাদের গবেষণার মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তা ও তেজস্ক্রিয় মৌল সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান আরও বিস্তৃত হয়।

ফিশনের রহস্য

ইউরেনিয়ামের শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রহস্য উন্মোচিত হয় ১৯৩৮ সালে।

জার্মান বিজ্ঞানী অটো হান ও ফ্রিৎজ স্ট্র্যাসম্যান পরীক্ষায় দেখান, নিউট্রন দিয়ে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে সেটি ভেঙে তুলনামূলক হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত হতে পারে। এ সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি ও তাপ নির্গত হয়।

ছবি সংগৃহীত

এই প্রক্রিয়ার নাম নিউক্লিয়ার ফিশন বা পারমাণবিক বিভাজন। পরে বিজ্ঞানী লিজে মাইটনার ও অটো ফ্রিশ এই প্রক্রিয়ার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন।

ফিশনের সময় শুধু শক্তিই বের হয় না, নতুন নিউট্রনও তৈরি হয়। এসব নিউট্রন আবার অন্য ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসে আঘাত করতে পারে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে ফিশন চলতে থাকলে তৈরি হয় নিউক্লিয়ার চেইন রিয়েকশন বা পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া।

চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত শক্তি

এই চেইন রিয়েকশন নিয়ন্ত্রণে আনার পথ খুলে যায় ১৯৪২ সালে। ইতালীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মির নেতৃত্বে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম পারমাণবিক চুল্লি চালু হয়। সেখানে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিয়েকশন সফলভাবে ঘটানো হয়।

এর মাধ্যমে ইউরেনিয়াম থেকে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শক্তি উৎপাদনের বাস্তব পথ তৈরি হয়।

বর্তমানে ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রিত ফিশন থেকে তাপ উৎপন্ন করা হয়। সেই তাপে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হয়। বাষ্পের চাপে টারবাইন ঘোরে। আর টারবাইনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।

ছবি সংগৃহীত

ইউরেনিয়ামের শক্তির ঘনত্বও অত্যন্ত বেশি। প্রচলিত জ্বালানির তুলনায় অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম থেকে বিপুল শক্তি পাওয়া যায়। এ কারণে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তুলনামূলক কম জ্বালানি ব্যবহার করেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

জীবাশ্ম জ্বালানির মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনও তুলনামূলক কম। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তিকে অনেক দেশ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করে।

চিকিৎসা ও গবেষণায় ব্যবহার

ইউরেনিয়াম ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও পারমাণবিক প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ক্যানসারের চিকিৎসা, রোগ নির্ণয় এবং শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে নিউক্লিয়ার মেডিসিন গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত

তেজস্ক্রিয় রশ্মি ব্যবহার করে চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করাও সম্ভব। এ ছাড়া শিল্প ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার রয়েছে।

ভূতত্ত্বেও ইউরেনিয়ামের বিশেষ গুরুত্ব আছে। ইউরেনিয়াম-লেড ডেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে অত্যন্ত পুরোনো শিলা ও খনিজের বয়স নির্ধারণ করা যায়। ইউরেনিয়াম ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে সিসায় রূপান্তরিত হয়। এই ক্ষয়ের হার হিসাব করে নমুনার বয়স নির্ণয় করা সম্ভব।

অন্ধকার দিক

ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এর সামরিক ব্যবহার।

ইউরেনিয়াম-২৩৫ একটি ফিশাইল আইসোটোপ। এর ঘনত্ব নির্দিষ্ট মাত্রায় বাড়ানো হলে নিয়ন্ত্রিত নয়, এমন দ্রুত শৃঙ্খল বিক্রিয়া ঘটানো সম্ভব। পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগানো হয়েছে।

জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলা/ ছবি সংগৃহীত

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানের হিরোশিমায় ইউরেনিয়াম-ভিত্তিক পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়। কয়েক দিন পর নাগাসাকিতে ব্যবহার করা হয় আরেকটি পারমাণবিক বোমা। দুই শহরেই ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মানুষের ওপর পড়েছিল।

এ কারণেই ইউরেনিয়াম একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকির প্রতীক।

একদিকে এই মৌল পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বিপুল মানুষের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পারে। অন্যদিকে এর অপব্যবহার ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

তাই ইউরেনিয়ামের শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত পারমাণবিক নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অস্ত্র বিস্তার রোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এক টুকরো পাথরের মতো দেখতে এই মৌল তাই শুধু একটি ধাতু নয়। এর ভেতরের শক্তি মানুষের জন্য যেমন আশীর্বাদ হতে পারে, তেমনি ভুল ব্যবহারে হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর অভিশাপ।

আরও পড়ুন