EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

২৪ বছর ট্রফিহীন, তবু ২০৩০ বিশ্বকাপ নিয়ে কেন এত আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিল সমর্থকরা?

শতবর্ষী বিশ্বকাপের মঞ্চে ভিনিসিয়ুস-রদ্রিগো-এন্দ্রিকদের ঘিরে কেন নতুন করে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের কোটি কোটি ব্রাজিল সমর্থক, জানুন বিস্তারিত

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১১:৪০ এএম

২৪ বছর ট্রফিহীন, তবু ২০৩০ বিশ্বকাপ নিয়ে কেন এত আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিল সমর্থকরা?

ম্যাচ শেষে উল্লাসে মেতেছেন ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা। ছবি: রয়টার্স

অ অ

২০০২ সালের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়া, কাতার হয়ে সর্বশেষ ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপ— কোথাও মেলেনি সোনালি ট্রফির দেখা। ২০৩০ সালে যখন পূর্ণ হবে টানা ২৮ বছরের এই অপেক্ষা, তখনও কি খালি হাতেই থাকবে ব্রাজিল? উল্টো ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়ার পর মনে হচ্ছিল, সাম্বার ছন্দ বুঝি হারিয়ে গেছে চিরতরে।

অথচ অবাক করা ব্যাপার হলো— ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হতে না হতেই সোশ্যাল মিডিয়া ভরে গেছে নতুন এক স্লোগানে: ‘মিশন হেক্সা ২০৩০’ দীর্ঘ ট্রফিখরা সত্ত্বেও এই আকাশছোঁয়া আত্মবিশ্বাসের উৎসটা আসলে কোথায়? চলুন খুঁজে দেখি।

শতবর্ষের মঞ্চ, আর সেখানেই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুযোগ

২০৩০ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিশেষ আসর। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে এই টুর্নামেন্ট আয়োজিত হবে ছয়টি দেশ মিলিয়ে— মূল আয়োজক থাকবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন, আর শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে টুর্নামেন্টের প্রথম তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকায়— উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। উরুগুয়েকে এই সম্মান দেওয়া হচ্ছে কারণ সেখানেই হয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনাকে দেওয়া হচ্ছে সেই আসরের রানার্সআপ হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ, আর প্যারাগুয়ে পাচ্ছে কনমেবলের সদর দপ্তর হওয়ার সুবাদে।

এই আয়োজনের একটা বড় দিক হলো— স্পেন ও পর্তুগাল ব্রাজিলের ফুটবলারদের জন্য প্রায় ঘরের মাঠের মতো পরিবেশ। ভাষাগত সাদৃশ্য (পর্তুগিজ), সাংস্কৃতিক মিল এবং ইউরোপীয় লিগে খেলা অভিজ্ঞতা— সবকিছু মিলিয়ে সেখানে মানিয়ে নেওয়াটা ব্রাজিলের জন্য তুলনামূলক সহজ হবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ বিশ্বাস করেন, শতবর্ষের এই ঐতিহাসিক মঞ্চ যেন ব্রাজিলের মতো এক কিংবদন্তি দলের জন্যই সাজানো হচ্ছে।

তরুণ প্রজন্মের বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার সময়

২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের যে তরুণ স্কোয়াড অভিজ্ঞতার অভাবে খানিকটা ভুগেছিল, ২০৩০ সালে এসে তারাই পার করবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিণত সময়টা।

ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও রদ্রিগো— ২০৩০ বিশ্বকাপের সময় দুজনেরই বয়স হবে ২৯ বছর, একজন ফরোয়ার্ডের জন্য যা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে পরিপক্ব সময় হিসেবে বিবেচিত।

এন্দ্রিক— বিস্ময়বালক খ্যাত এই তরুণের বয়স তখন হবে ২৩। ততদিনে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপীয় ফুটবলে অভিজ্ঞতা বাড়িয়ে তিনি হয়ে উঠতে পারেন ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা।

সঙ্গে সাভিও, ভিটোর রোকের মতো তরুণরাও ততদিনে পরিণত হবেন অভিজ্ঞ যোদ্ধায়।

‘ইউরোপীয় ভয়’ কাটিয়ে ওঠার প্রত্যয়

২০০২ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবারই নকআউট পর্বে ইউরোপের কোনো না কোনো দলের কাছে হেরে বিদায় নেওয়াটা ব্রাজিলের জন্য একরকম মনস্তাত্ত্বিক দেয়ালে পরিণত হয়েছে। তবে ২০২৬-এর ধাক্কার পর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কর্তৃপক্ষ ঘরোয়া কাঠামো ও কৌশলে পরিবর্তন আনার আলোচনা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে— লক্ষ্য, ইউরোপীয় ঘরানার গতিময় ও শারীরিক শক্তিনির্ভর ফুটবলের বিপরীতে কার্যকর কাউন্টার-কৌশল তৈরি করা। এই আত্মপর্যালোচনাই হতে পারে পরবর্তী চার বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।

ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাস ঘাঁটলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে— তারা যখনই দীর্ঘ খরায় ভুগেছে, ঠিক তখনই ফিরে এসেছে আরও শক্তিশালী হয়ে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৯৪ সালে আবার বিশ্বসেরা হয়েছিল তারা। ২০০২-এর পর ২০৩০ সাল হবে ঠিক তেমনই একটা দীর্ঘ চক্রের সমাপ্তি বিন্দু—আর ইতিহাস বলছে, এমন দীর্ঘ অপেক্ষার পরই ব্রাজিল সবচেয়ে ভয়ংকর রূপে ফিরে আসে।

বাংলাদেশিদের সমর্থন যা এক অনন্য শক্তি

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাগুলোর একটি বাংলাদেশ, যদিও দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব হাজার হাজার মাইল। প্রতিটি বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের গ্রাম-শহর ছেয়ে যায় হলুদ-সবুজ পতাকায়। ছাদে, দেয়ালে, ধানক্ষেতের পাশে বিশাল আকৃতির ব্রাজিলের পতাকা আঁকা কিংবা টাঙানো এখন আমাদের দেশের এক পরিচিত দৃশ্য—যা বিশ্ব গণমাধ্যমেও একাধিকবার আলোচিত হয়েছে। বরিশাল, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে যে উন্মাদনা আর সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়, তা বিশ্বের খুব কম দেশেই এমন তীব্রতায় দেখা মেলে—অথচ এই দুই দলের কোনোটাতেই বাংলাদেশের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।

ফুটবলে অতীত রেকর্ড বা আবেগ দিয়ে ট্রফি জেতা যায় না—দরকার মাঠের নিখুঁত পারফরম্যান্স। তবে মিশন হেক্সা ২০৩০-কে নিছক কল্পনা ভাবাটাও ভুল হবে। যে দলে প্রতিভার জোয়ার কখনো থামে না, যেখানে ফুটবল একরকম ধর্মের মতো লালিত হয়, সেই ব্রাজিলকে ফেভারিটের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কঠিন। ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষে ২০৩০ সালের মরক্কো, স্পেন বা পর্তুগালের কোনো এক স্টেডিয়ামে হয়তো ষষ্ঠ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরে ভিনিসিয়ুসরা বলতেই পারেন— ‘দেরি হলো, কিন্তু হেক্সা আমরাই নিয়ে এলাম।’  

আরও পড়ুন