নায়ক হতে গিয়ে ‘দ্য ভিলেন অফ দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ — কে এই মানুষটা?
যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, তারপর দশজনের আর্জেন্টিনা—৩৭ সেকেন্ডেই গড়ে ওঠে স্পেনের জয়ের ভিত্তি
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের কাছ থেকে লাল কার্ড দেখছেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ (২৪); ছবি: নিউ ইয়র্ক পোস্ট
ঘড়িতে তখন যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিট। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের গ্যালারি নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে। স্কোরলাইন তখনও ০-০, বিশ্বকাপ ফাইনাল গড়াতে চলেছে অতিরিক্ত সময়ে। ঠিক তখনই মাঠের এক কোণে ঘটে যায় এমন এক মুহূর্ত, যা বদলে দেয় গোটা ফাইনালের গতিপথ। একটা এলোমেলো বলের পেছনে ছুটতে গিয়ে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বসেন আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের এক নির্ভরযোগ্য মুখ। রেফারি স্লাভকো ভিনচিচের হাত পকেটে যায়, বেরিয়ে আসে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে।
দুই হাজার বাইশে যিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের গল্পের অন্যতম নায়ক, ২০২৬-এ এসে ঠিক ফাইনালের মঞ্চেই তিনি হয়ে গেলেন প্রশ্নবিদ্ধ এক নাম। কে এই খেলোয়াড়, যাঁর একটি মুহূর্তের ভুল বদলে দিল গোটা বিশ্বকাপের ভাগ্য? চলুন জেনে নেওয়া যাক পুরো ঘটনা।
যে মুহূর্তে বদলে যায় ফাইনালের ভাগ্য
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা ছিল রক্ষণাত্মক ছকে। স্পেন বল দখলে রেখে একের পর এক আক্রমণ সাজালেও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের দৃঢ়তায় বারবার আটকে যাচ্ছিল তারা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়। কিন্তু যোগ করা সময়ের ঠিক আগে ঘটে যায় সেই টার্নিং পয়েন্ট।
আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের সেই ‘ভিলেন’ আর কেউ নন— এনজো ফার্নান্দেজ। প্রথমার্ধেই একবার সিমুলেশনের জন্য হলুদ কার্ড দেখেছিলেন তিনি। তারপরও যোগ করা সময়ে একটি ঢিলেঢালা বলের দখল নিতে গিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে যেভাবে ধাক্কা দেন, তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এক ঝুঁকি। ফলাফল—দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, লাল কার্ড, এবং দশজনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। পুরো অতিরিক্ত সময়টাই একজন কম নিয়ে খেলতে হয় লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের।
এর ঠিক কিছুক্ষণ পরই, অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায়, পেদ্রো পোরোর ক্রস থেকে ফেরান তোরেসের গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। সেই একটি গোলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়নের নাম।
নায়ক থেকে ভিলেন হওয়ার গল্প
এনজো ফার্নান্দেজের নাম আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে আগে থেকেই লেখা ছিল সোনার অক্ষরে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তরুণ এই মিডফিল্ডার আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন, জিতেছিলেন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কারও। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় দলের মাঝমাঠে তাঁর ওপর ভরসা রেখেছেন কোচ স্কালোনি।
কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে একটি মুহূর্তই একজন খেলোয়াড়ের পরিচয় বদলে দিতে পারে। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো মঞ্চে, শিরোপা নির্ধারণী মুহূর্তে যখন দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্তের, তখনই এনজোর তাড়াহুড়ো করা একটি ট্যাকল আর্জেন্টিনাকে ঠেলে দেয় কঠিন এক পরিস্থিতিতে।
দশজনের দল নিয়ে টানা ৩০ মিনিটের বেশি সময় স্পেনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব একটি চ্যালেঞ্জ ছিল—আর সেই চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছিলেন এনজো নিজেই।
পরিসংখ্যান যা বলছে
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা মাত্র তিনটি শট নিতে পেরেছিল, যার একটিও ছিল না লক্ষ্যে।
১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম কোনো দল বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে একটিও শট নিতে ব্যর্থ হয়।
লাল কার্ড দেখার পর দশজনের আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে একাই আগলে রেখেছিলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, করেছিলেন আটটির বেশি সেভ।
অতিরিক্ত সময় শুরুর ৩৭ সেকেন্ডের মধ্যেই আসে স্পেনের জয়সূচক গোল।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট করে দেয়, এনজোর লাল কার্ড শুধু প্রতীকী কোনো ঘটনা ছিল না—এটি সরাসরি আর্জেন্টিনার হারের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মেসির শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা যেখানে ট্রফি দিয়ে রাঙানোর কথা ছিল, সেখানে এনজোর অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত পুরো দলকেই বিপদে ফেলে দেয় বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও কোচ স্কালোনির রক্ষণাত্মক কৌশল এবং একাধিক ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে ব্যাপকভাবে, তবু ফাইনালের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে এনজোর লাল কার্ডই থেকে যাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে।
বিশ্বকাপের ‘ভিলেন’ তকমা নতুন নয়
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ‘নায়ক থেকে ভিলেন’ হয়ে ওঠার গল্প নতুন নয়। প্রতিটি বিশ্বকাপই মনে রাখে এমন কিছু মুহূর্ত, যেখানে একজন কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই ঘটে যায় সবচেয়ে বড় ভুল। এনজো ফার্নান্দেজের এই লাল কার্ডও তেমনই একটি অধ্যায় হয়ে থাকল ২০২৬ বিশ্বকাপের ইতিহাসে।
তবে ফুটবলে ভিলেন তকমা কখনোই স্থায়ী হয় না। এনজোর বয়স মাত্র ২৪। সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার এবং হয়তো আরও একটি বিশ্বকাপে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। ফুটবল ইতিহাস বলছে, আজকের ভিলেনই কাল হয়ে উঠতে পারেন আবার নায়ক।
