আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নয়, এবারের বিশ্বকাপ ট্রফি যাবে ফ্রান্সে?
রাউন্ড অব ১৬-তে ফ্রান্স, সুইডেনকে হারিয়ে এমবাপের গোল ১৮; শনিবার প্যারাগুয়ের মুখোমুখি দেশমের দল
ছবি: গেটি ইমেজ
বিশ্বকাপ মানেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল বিতর্ক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডায় চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ পেরিয়ে রাউন্ড অব ১৬-তে যে দলটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে, তার নাম ফ্রান্স। সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নকআউট পর্বের পরের ধাপে পা রেখেছে দিদিয়ের দেশমের দল, আর সেই জয়ে আবারও নায়ক অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে।
মঙ্গলবার রাতে ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে মাইকেল ওলিসের বাড়ানো বলে দলকে এগিয়ে দেন এমবাপে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্র্যাডলি বারকোলার গোলে ব্যবধান বাড়ে, আর শেষ দিকে ওলিসের দুর্দান্ত থ্রু বল থেকে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ফরাসি অধিনায়ক। এই গোল দুটি দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্যক্তিগত গোলসংখ্যায় এমবাপে পৌঁছে গেছেন ১৮-তে, যা তাকে এই মুহূর্তে চলতি আসরের যৌথ শীর্ষ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে লিওনেল মেসির পাশে।
দলের আরেক তারকা ওসমান দেম্বেলের কথা না বললেই নয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেন এই ব্যালন ডি’অর জয়ী উইঙ্গার, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই জয় পেল ফ্রান্স, যে বছর তারা প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি আবেগঘন গল্পও। নরওয়ে ম্যাচের আগে মায়ের মৃত্যুর খবরে দেশে ফিরে যান কোচ দিদিয়ের দেশম, দলের দায়িত্বে ছিলেন সহকারী কোচ গাই স্তেফান। বিশ্বকাপ শেষেই ১৪ বছরের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা জানিয়ে রেখেছেন দেশম, ফলে শেষবারের মতো শিরোপা জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নামছে তার দল। রাউন্ড অব ১৬-তে শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ প্যারাগুয়ে, যারা চমক দেখিয়ে বিদায় করে দিয়েছে জার্মানিকে।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় নতুন ইতিহাস গড়েছেন লিওনেল মেসি। মিরোস্লাভ ক্লোজার ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে বর্তমানে তার গোলসংখ্যা ১৯, যা পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ মিলিয়েও সর্বোচ্চ। চলতি আসরে এখন পর্যন্ত ৬ গোল করা মেসিকে নিয়ে গ্রুপ পর্ব অপরাজিত থেকে শীর্ষে থেকেই নকআউটে উঠেছে আর্জেন্টিনা। তবে বাস্তবতা হলো, দলের আক্রমণ এখনো অনেকাংশে মেসিনির্ভর। রাউন্ড অব ৩২-এ শুক্রবার মায়ামিতে বিশ্বকাপ অভিষিক্ত কেপ ভার্দের মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে তিন ম্যাচের সবকটিতে ড্র করে নকআউটে পৌঁছে ইতিমধ্যে ইতিহাস গড়েছে—বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশ তারা। তাদের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া রীতিমতো তারকা বনে গেছেন; স্পেনের বিপক্ষে একাই সাত সেভ করার পর তার ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ মিলিয়নের বেশি।
ব্রাজিলের পথও খুব মসৃণ নয়। জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২- এর ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের ঠিক আগে বদলি নামা গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে কোনোরকমে ২-১ ব্যবধানে জিতে রাউন্ড অব ১৬ নিশ্চিত করে কার্লো আনচেলত্তির দল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র গ্রুপ পর্বে চার গোল করে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন, আর চোট কাটিয়ে ফেরা নেইমার এখনো মূলত বদলি হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছেন। রাউন্ড অব ১৬-তে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ নরওয়ে, যারা আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে উঠেছে পরের ধাপে। এই ম্যাচে এরলিং হাল্যান্ডকে সামলানোই হতে যাচ্ছে ব্রাজিল রক্ষণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
পরিসংখ্যান আর মাঠের পারফরম্যান্স মিলিয়ে দেখলে ফ্রান্সকে এই মুহূর্তে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখার মতো কারণ যথেষ্ট। গ্রুপ পর্বে একমাত্র দল হিসেবে তিন ম্যাচেই জয়, আক্রমণে এমবাপে-দেম্বেলে-ওলিসের ত্রিফলা এবং প্রতিটি ম্যাচে অন্তত তিন গোল করার ধারাবাহিকতা তাদের হট ফেভারিটের কাতারে নিয়ে গেছে।
তবে ফুটবলে অঘটনের নজির কম নয়— নেদারল্যান্ডস পেনাল্টিতে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে, জার্মানিকে চমকে দিয়েছে প্যারাগুয়ে। কেপ ভার্দের মতো দল যেভাবে ইতিহাস গড়ে চলেছে, তাতে শেষ পর্যন্ত শিরোপা কার ঘরে যাবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে আপাতত মাঠের খেলা আর পরিসংখ্যান দুই-ই বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দল হিসেবে এগিয়ে আছে ফ্রান্সই।
