কুরাসাও-কেপ ভার্দে পারল, বাংলাদেশ পারল না কেন?
সমর্থক থেকে অংশগ্রহণকারী হতে বাংলাদেশের আর কত অপেক্ষা...
বড় পর্দায় বিশ্বকাপ দেখছেন উৎসুক দর্শকরা— নিজের দেশ মাঠে নেই, তবু আবেগে কমতি নেই। ছবি: আহাদুল করিম খান
বিশ্বকাপ এলেই দৃশ্যটা চেনা। ঢাকার সরু গলি থেকে মফস্বলের টিনের চাল— সবখানে ওড়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ইতালি কিংবা ফ্রান্সের পতাকা। কেউ জমি বিক্রি করে বানান শত গজের পতাকা, কেউ ঘরের দেয়াল রাঙান পছন্দের দলের রঙে। অলিম্পিক এলে টেলিভিশনের সামনে বসে আমরা বিস্মিত হই অন্য দেশের সাফল্যে।
সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে বিশ্বেও এখন আমাদের একটি বড় পরিচয় দাঁড়িয়ে গেছে—আমরা বিশ্বের অন্যতম বড় ফুটবল-পাগল জাতি, যাদের প্রিয় দল নিজের দেশের নয়। আমরা কি শুধু অন্য দেশের পতাকা উড়িয়ে যাব, অন্য দেশের বিজয় উদ্যাপন করব, আর নিজের স্বপ্নকে দূরে সরিয়ে রাখব?
১৭ কোটির বেশি মানুষের এই দেশ। গত দুই দশকে অর্থনীতি বেড়েছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি ও সচেতনতাও বহুগুণ বেড়েছে। তারপরও প্রশ্নটা থেকেই যায়— এত মানুষ, এত তরুণ, এত আবেগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন এখনো দর্শক? কেন আমরা এখনো অংশগ্রহণের চেয়ে সমর্থনেই সীমাবদ্ধ?
এই প্রশ্ন কেবল আবেগের নয়। এটি রাষ্ট্রনীতি, পরিকল্পনা এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। বাংলাদেশ ফুটবল ভালোবাসে, তার প্রমাণ প্রতি বিশ্বকাপেই মেলে। কিন্তু ভালোবাসা কখনো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। এমনকি এশিয়ার বাছাইপর্বেও ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়নি।
উত্তর খুঁজতে সবচেয়ে বেশি যে তুলনাটি সামনে আসে, তা হলো কেপ ভার্দে। আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলের এই দ্বীপরাষ্ট্রের জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখেরও কম— বাংলাদেশের এক শতাংশেরও কম। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে শক্তিশালী ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে, ঘরের মাঠে টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে একটিও গোল না হজম করে ইতিহাস গড়ে তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। কিছুদিন আগেও বিশ্ব এই দেশের নামটাই ভালোভাবে জানত না।
কেপ ভার্দে একা নয়। ক্যারিবীয় দ্বীপ কুরাসাও, জনসংখ্যা মাত্র দেড় লাখের কিছু বেশি, গত নভেম্বরে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে এই মঞ্চে ওঠার রেকর্ড গড়েছে। ২০১৮ সালে সাড়ে তিন লাখ মানুষের আইসল্যান্ডও এই তালিকায় নাম লিখিয়েছিল। এই দলগুলোর কোনোটিরই ইউরোপের শীর্ষ লিগে বিশাল তারকা নেই, নেই বিপুল বাজেট, নেই বাংলাদেশের মতো জনশক্তি বা ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি। তবু তারা পেরেছে, যেখানে বাংলাদেশ পারেনি। এখানেই প্রশ্নটা তীব্র হয়ে ওঠে— সমস্যাটা তাহলে আসলে কোথায়?
সাম্প্রতিক ফিফা র্যাঙ্কিং অবশ্য পুরোপুরি হতাশার ছবি দেখায় না। ২০২৬ সালের হালনাগাদ তালিকায় বাংলাদেশ ২১১টি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে ১৮০ নম্বরে, যা গত প্রায় এক দশকের সেরা। ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থান ছিল ১৯৯৬ সালে, ১১০ নম্বরে। এরপর দীর্ঘ পতনের ধারায় ২০১৮ সালে র্যাঙ্কিং নেমে যায় ১৯৭-এ, যা দলের সর্বনিম্ন। প্রতিবেশী ভারত এখনো এগিয়ে, অবস্থান ১৪১ নম্বরে। বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেনি, আর এএফসি এশিয়ান কাপেও মাত্র একবার অংশ নিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি নাম নতুন আশার জন্ম দিয়েছে— হামজা দেওয়ান চৌধুরী। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা এই মিডফিল্ডার ২০২৫ সালের মার্চে জাতীয় দলে অভিষেকের পর দলের খেলার ধরনেই পরিবর্তন এনেছেন বলে মনে করছেন খেলোয়াড়রা নিজেরাই। এর প্রতিফলন মিলেছে মাঠেও— মিয়ানমারকে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি নারী ফুটবল দলও এগিয়েছে দ্রুত—২০২৫ সালে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ২৪ ধাপ উন্নতি করে ১০৪ নম্বরে ওঠে তারা। প্রমাণ করে, সঠিক বিনিয়োগ থাকলে উন্নতি অসম্ভব নয়।
সমস্যাটা আসলে কোথায়
কেপ ভার্দে বা কুরাসাও যখন কেবল সুসংগঠিত পরিকল্পনা দিয়েই বিশ্বকাপে পৌঁছে যায়, তখন বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ বারবার সামনে আসে—
স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের অভাবে প্রতিভা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াই দুর্বল। বাংলাদেশ ফুটবল লিগের পেশাদারিত্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতা এখনো প্রতিবেশী অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে। মানসম্মত মাঠ ও আন্তর্জাতিক মানের কোচের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। স্বল্পমেয়াদী ফলাফলনির্ভর সিদ্ধান্ত প্রায়ই টেকসই উন্নয়নকে ছাপিয়ে যায়। জাতীয় ক্রীড়া বাজেট, মিডিয়া কভারেজ ও স্পনসরশিপের সিংহভাগ ক্রিকেটমুখী।
হামজা চৌধুরীর আবির্ভাব বা এশিয়ান কাপে প্রথমবার মূল পর্বে ওঠার মতো ঘটনা আশার সঞ্চার করে ঠিকই, কিন্তু কেপ ভার্দে-কুরাসাওয়ের উদাহরণ মনে করিয়ে দেয়— জনসংখ্যা বা অর্থনীতির আকার নয়, দরকার সুসংগঠিত ও ধারাবাহিক পরিকল্পনা।প্রশ্নটা তাই ফিরে আসে রাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকারের জায়গায়।
তৃণমূল ফুটবল, ঘরোয়া লিগের মান, প্রশিক্ষণ কাঠামো ও ধারাবাহিক বিনিয়োগে মনোযোগ না দিলে ছাদের পতাকা বদলাবে না— বদলাবে না দর্শক-আসনে বসে থাকার অভ্যাসও। আর যতদিন এই বদল না আসবে, ততদিন বিশ্বকাপ মানে বাংলাদেশের জন্য থেকে যাবে অন্যের উৎসবে অতিথি হওয়ার গল্প— নিজের দেশ যেন আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলই, শুধু ঠিকানাটা বদলে গেছে।
