EN ☀️
×

Follow Us

আন্তর্জাতিক

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ইরান-রাশিয়াসহ বিশ্বের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:০১ পিএম

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ইরান-রাশিয়াসহ বিশ্বের ওপর কী প্রভাব ফেলবে?

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের দুই কক্ষেই জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। এই ফলাফল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিভিন্ন সংঘাতের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ভূমিকা ছিল বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও যুদ্ধকে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফলাফলকে বিভিন্ন দেশ নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে দেখছে। তবে এর ফলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে কী পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যকার সম্পর্কের ওপর। 

ইরান: নীতিতে পরিবর্তনের আশা কম

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে ইরানের নেতৃত্ব ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, মার্কিন রাজনীতির পরিবর্তনের কারণে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা শেষ হবে—এমন ধারণা ভুল।

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা চালালে এর জবাব আরও ব্যাপক হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

এদিকে, নির্বাচনের ফলাফলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেছেন দেশটির প্রধান আলোচক। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি যখন চাইবেন, তখনই এই সংঘাতের অবসান হবে।

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি দুই ডলারের নিচে নামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু গত অক্টোবরে দেশটিতে পেট্রোলের গড় দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ৩১ ডলার। 

উপসাগরীয় দেশগুলো: সম্পর্কের সমীকরণে নতুন ভাবনা

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় এসব দেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।

ট্রাম্পের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গেও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। দুবাইয়ে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ কোর্স রয়েছে। কাতার তাঁকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিমান উপহার দিয়েছে। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরব সম্মিলিতভাবে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠান অ্যাফিনিটি ক্যাপিটালে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। বিপরীতে, তাঁর ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরি জো বাইডেনের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ছিল টানাপোড়েনপূর্ণ।

তবে ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প সম্পর্কে উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে পারে। যুদ্ধ আবার শুরু হলে পুরো অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

চীন: বাণিজ্য চুক্তিতে নতুন সুযোগ

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে চীন একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। চলতি মাসের শেষ দিকে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসন চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে চীনও মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে খেলনা ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি চীন মার্কিন কৃষিপণ্য কেনাও কমিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোর কৃষকদের ওপর।

দুই দেশের এই বাণিজ্যযুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এর মেয়াদ জানুয়ারির শেষে শেষ হওয়ার কথা। নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প বাণিজ্যিক বিরোধ কমিয়ে নতুন চুক্তির দিকে এগোতে পারেন বলে মনে করছে চীন।

তবে নতুন চুক্তির শর্ত ও দুই দেশের অবস্থানের ওপরই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ভর করবে। 

রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তা

মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ আশা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্প তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ অব্যাহত রাখবেন।

পেসকভ জানিয়েছেন, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার আরেকটি পর্ব আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে আবুধাবিতে এ আলোচনা হওয়ার কথা।

তবে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস যাওয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তি বা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে মস্কো আগের মতোই ইউক্রেন ও ইউরোপকে দায়ী করতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর আগ্রহের কারণে রাশিয়া সরাসরি ট্রাম্পকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ইউক্রেন: নিষেধাজ্ঞার আশা, নীতিগত অনিশ্চয়তা

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় কিয়েভের উদ্বেগ বাড়ছে।

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের ফলে রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে সমর্থন বাড়তে পারে বলে আশা করছেন ইউক্রেনের কেউ কেউ। তবে অন্যদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ইউক্রেন নিয়ে মার্কিন নীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। 

বিশ্ব রাজনীতিতে কী বার্তা দিল এই নির্বাচন?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছে। ইউক্রেনের জন্য এটি রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আর চীন দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ।

তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। যুদ্ধ, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কংগ্রেসের ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি ইরান, রাশিয়া, ইউক্রেন, চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে।

সূত্র: বিবিসি

আরও পড়ুন