EN ☀️
×

Follow Us

অর্থনীতি

ফ্ল্যাট বিক্রিতে স্থবিরতা, প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম

ফ্ল্যাট বিক্রিতে স্থবিরতা, প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বাংলাদেশের আবাসন খাতে ফ্ল্যাট বিক্রির গতি কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, ব্যাংকিং, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন খাতে। উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আবাসন ব্যবসায় চাপ তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে সম্ভাব্য ক্রেতারা ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন প্রকল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সতর্কতা বাড়ছে।

আবাসন খাতের সংকট শুধু ফ্ল্যাট কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, পাথর, টাইলস, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও স্যানিটারি পণ্যের মতো বিভিন্ন শিল্প। পাশাপাশি নির্মাণকাজে যুক্ত থাকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও পরিবহন ব্যবসায়ী। ফলে আবাসন খাতে স্থবিরতা তৈরি হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার আবাসিক ফ্ল্যাট বিক্রির গতি আগের তুলনায় কমেছে। চাহিদা থাকলেও অনেক সম্ভাব্য ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। ফলে বাজারে ফ্ল্যাটের সরবরাহ থাকলেও প্রত্যাশিত বিক্রি হচ্ছে না। এতে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থপ্রবাহ ও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


নির্মাণসামগ্রীর বাজারে চাপ

একটি আবাসিক প্রকল্পের কাজ শুরু হলে রড, সিমেন্ট, ইট, বালু, পাথরসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা তৈরি হয়। একই সঙ্গে টাইলস, স্যানিটারি পণ্য, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারেও ব্যবসার সুযোগ বাড়ে।

কিন্তু নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে গেলে কিংবা নির্মাণকাজের গতি মন্থর হলে এসব পণ্যের চাহিদাও কমতে পারে। এতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা, ছোট সরবরাহকারী এবং পরিবহন ব্যবসায়ীরা চাপের মুখে পড়তে পারেন।

নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকলে কারখানার উৎপাদন ও বিক্রির ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে আবাসন খাতের মন্দা একটি ভবন বা প্রকল্পের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর শিল্পশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করতে পারে।

কর্মসংস্থান ও শ্রমিকের আয়ে প্রভাব

আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমিক। এ ছাড়া প্রকৌশলী, স্থপতি, ঠিকাদার ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশাজীবীরাও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

নির্মাণকাজ কমে গেলে শ্রমিকদের কাজের সুযোগ ও আয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে তাদের পরিবারের ব্যয় সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার শ্রমিকদের আয় কমলে স্থানীয় দোকানপাট, পরিবহন ও অন্যান্য সেবামূলক ব্যবসায়ও চাহিদা কমতে পারে।

অর্থনীতিতে এ ধরনের প্রভাবকে বহুমাত্রিক প্রভাব হিসেবে দেখা হয়। একটি খাতে আয় ও ব্যয় কমে গেলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট অন্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আবাসন খাতের স্থবিরতা কর্মসংস্থান ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

উচ্চ সুদে বাড়ছে ফ্ল্যাট কেনার চাপ

ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের একটি বড় বিবেচ্য বিষয় গৃহঋণের খরচ। ঋণের সুদের হার বেশি হলে মাসিক কিস্তির পরিমাণ বেড়ে যায়। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়লে পরিবারের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনার জন্য অর্থের সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে পারেন। এতে ডেভেলপারদের ফ্ল্যাট বিক্রি থেকে অর্থপ্রাপ্তি বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অথচ নির্মাণকাজ চালানো, শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ এবং নির্মাণসামগ্রী কেনার জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়।

আবাসন খাতের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গৃহঋণের মাধ্যমে ক্রেতারা ফ্ল্যাট কেনেন, আর আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্নভাবে ব্যাংকঋণ ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই ঋণের ব্যয়, ক্রেতার সক্ষমতা ও আবাসন ব্যবসার অর্থপ্রবাহ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আবাসনের সঙ্গে জড়িত ভোক্তাপণ্যের বাজারও

নতুন ফ্ল্যাট কেনার পর একটি পরিবারের প্রয়োজন হয় খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, পর্দা, ফ্রিজ, টেলিভিশন, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, লাইটিং ও অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্য। পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগসহ বিভিন্ন সেবার চাহিদাও তৈরি হয়।

ফলে আবাসন খাত সচল থাকলে নির্মাণশিল্পের বাইরেও আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিকস, হোম ডেকর ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের বাজারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সুযোগ থাকে। বিপরীতে নতুন ফ্ল্যাট কেনা ও বসবাস শুরু করার গতি কমলে এসব পণ্যের অতিরিক্ত চাহিদা তৈরির সুযোগও সীমিত হতে পারে।

এ কারণে আবাসন খাতকে শুধু ভবন নির্মাণের ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন, বিপণন, পরিবহন ও ভোক্তাব্যয়ের সম্পর্ক রয়েছে।

সংকট কাটাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

আবাসন খাতের স্থবিরতা কাটাতে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নাও হতে পারে। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা, গৃহঋণের খরচ, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং বিনিয়োগের পরিবেশ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী ও দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুযোগ তৈরি, কর ও নিবন্ধন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা, নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা এবং জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা ও ব্যবসায়িক পরিবেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আবাসন ব্যবসা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর। তাই এ খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ ব্যয়, বাজারের চাহিদা ও নীতিগত পরিবেশ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

আবাসন খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে দেশীয় বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রচলিত আইন-বিধির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, ফ্ল্যাট বিক্রিতে স্থবিরতা আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এ খাতে বিনিয়োগ ও নির্মাণকাজের গতি বাড়লে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে। তাই আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া বৃহত্তর অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন