এদিন সরকার পতনের একদফা দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তারা জাতীয় সরকার গঠনের দাবিও জানায়।
বিক্ষোভকারীদের সাথে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গণভবনের দরজা খোলা। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘গুলি আর সন্ত্রাসের সাথে কোনো সংলাপ হয় না।’
টেলিগ্রামে দেওয়া বার্তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারের কাছে বিচার চাওয়া বা সংলাপে বসারও সুযোগ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে।’
বাংলাদেশে সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিংকেনের কাছে চিঠি পাঠান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন সেনেটর ও কংগ্রেসম্যান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় বিশাল সমাবেশ হয়, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
এছাড়া রংপুর, সিলেট, ফরিদপুর, রাজশাহী, বগুড়া, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের অনেক স্থানে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছিল সেদিন।
ওইদিনই শহীদ মিনারের বিশাল সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম। তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনেরও দাবি জানান।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করা হয়। পাল্টা কর্মসূচি হিসেবে সারা দেশে জমায়েতের কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ।
ছাত্র-জনতার দাবি মেনে নিয়ে অবিলম্বে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ওদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঢাকায় সেনা সদরে বিভিন্ন স্তরের সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পরে আইএসপিআর থেকে দেওয়া বিবৃতিতে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে আছে এবং থাকবে।’
ওদিকে, সেদিন গণভবনে একটি অনুষ্ঠানের পর কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে আটক সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে দাবি করেন শেখ হাসিনা।
ডেটলাইন ৪ আগস্ট
অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সরকারি নির্দেশে মোবাইলে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় অপারেটরগুলো।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’ চলাকালে সহিংসতায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক মানুষ নিহত হন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৩ জনই পুলিশ সদস্য বলে বাহিনীটি নিশ্চিত করে।
দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সাধারণ ছাত্র-জনতার মুখোমুখি না করার আহ্বান জানান সাবেক সেনাপ্রধান ও সেনা কর্মকর্তারা।
এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভুঁইয়া বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীকে অবিলম্বে সেনা ছাউনিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেকোনো আপদকালীন সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।’
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এক দফা দাবিতে ডাকা অসহযোগ আন্দোলন ঘিরে ‘জঙ্গি হামলার সতর্কতা জানিয়ে এদিন একটি বিবৃতি দেয় সরকার।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা মহানগরসহ সব বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, শিল্পাঞ্চল, জেলা সদর ও উপজেলা সদরে সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হলো।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন যারা নাশকতা করছে, তারা কেউ ছাত্র না, তারা সন্ত্রাসী।’ তাদের শক্ত হাতে দমন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ওদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার কেমন হবে তার একটি রূপরেখা ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
ওইদিনই শাহবাগে ব্যাপক জমায়েতের মধ্যে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
শুরুতে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনের কথা থাকলেও, পরে সেটি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট ঘোষণা করে আন্দোলনের নেতারা। সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সারাদেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান।
এছাড়া, সারা দেশের সকল জেলা, উপজেলা, গ্রামে এবং পাড়া-মহল্লায় ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গঠন করার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম।
ডেটলাইন ৫ আগস্ট
সকাল থেকেই কারফিউয়ের মধ্যেই ঢাকার রাস্তায় মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে আসতে থাকে মানুষ। সারাদেশে আবারও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে সরকারের ঘোষণা করা তিনদিনের সাধারণ ছুটি শুরু হয় সেদিন। বলা হয়েছিল যে, এই সময় সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় শহীদমিনার সংলগ্ন বকশীবাজার, রামপুরা-বনশ্রী এবং বসুন্ধরাসহ ঢাকার কয়েকটি পয়েন্টে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
এক পর্যায়ে খবর আসে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে তার হেলিকপ্টারে ওঠার সময়কার ভিডিও পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ‘সামরিক একটি হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যরা ভারতের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।’
যদিও পরবর্তীতে জানা যায় যে সামরিক বাহিনীর একটি উড়োজাহাজ তাদেরকে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায়, দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সময় দুপুর দুইটায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
দুপুরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সেনাপ্রধান। ওই বৈঠক শেষে বেলা চারটার দিকে সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে, ‘শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। আমরা এখন রাষ্ট্রপতির কাছে যাবো, সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করবো। আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রাখুন।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট গঠন করে আমরা কার্যক্রম পরিচালনা করবো।’
ওই রাতেই জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘অনতিবিলম্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে।’
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা আগামী চব্বিশ ঘণ্টার একটি অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করবেন এবং তাদের সমর্থিত বা প্রস্তাবিত ছাড়া কোনো সরকার তারা সমর্থন করবেন না।
সতের দিন পর এসে ৬ আগস্ট ভোর থেকেই কারফিউ তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয় আইএসপিআর।