EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

বাংলাদেশে কি আবারও ঘটতে পারে গণ-অভ্যুত্থান?

ভোটের অধিকার হরণ, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য আর দমনপীড়নের সংস্কৃতিই কি বারবার ডেকে আনে গণবিক্ষোভ

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

বাংলাদেশে কি আবারও ঘটতে পারে গণ-অভ্যুত্থান?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে আন্দোলনকারীদের সেই উত্তাল বিক্ষোভ, যা পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ছবি: আব্দুল করিম

অ অ

বাঙালি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—ইতিহাস প্রমাণ করেছে, এ দেশের মানুষ পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে বিস্ফোরিত হতে জানে।

২০২৪-এর অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আজ ৫ আগস্টে সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বাংলাদেশে কি আবারও এমন গণ-অভ্যুত্থান হতে পারে? দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, এই প্রশ্নের উত্তর কোনো জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার আচরণের ওপর।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণ-অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৯০ এবং ২০২৪—দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও মূল কারণগুলো ছিল প্রায় এক:

যখনই জনগণের ভোট দেওয়ার এবং নেতৃত্ব বাছাইয়ের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তখনই অভ্যুত্থানের বীজ রোপিত হয়েছে।

বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যখন দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়, তখন মানুষ রাজপথকে বেছে নেয়।

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে যেমন কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল, তার পেছনে ছিল তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব। যখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সব সুবিধা ভোগ করে আর সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়, তখন গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।

কোনো দেশেই গণ-অভ্যুত্থান নিয়মিত সমাধান হতে পারে না। এটি শাসনব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার লক্ষণ। ১৯৯০ সালের পর ভাবা হয়েছিল বাংলাদেশ একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে, কিন্তু দীর্ঘ তিন দশক পর ২০২৪ সালে এসে দেশবাসীকে আবারও রক্তের বিনিময়ে আরেকটি অভ্যুত্থান দেখতে হয়েছে।

এর অর্থ হলো—যদি কোনো সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা পূর্বসূরিদের ভুল থেকে শিক্ষা না নেয় এবং পুনরায় একই ধরনের একনায়কতান্ত্রিক আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তবে ভবিষ্যতে আবারও গণ-অভ্যুত্থান ঘটার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলে জনগণই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়।

একটি রাষ্ট্র বারবার অভ্যুত্থানের ধাক্কা সহ্য করতে পারে না, কারণ এতে অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে এমন চরম পরিস্থিতি এড়াতে এবং স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে তিনটি দেওয়াল তৈরি করা জরুরি:

নেতৃত্ব পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথ সবসময় খোলা রাখতে হবে, যাতে জনগণকে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য রাজপথে নামতে না হয়।

গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সমালোচনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষোভ চেপে রাখতে বাধ্য করলে তা পরবর্তীতে বিস্ফোরণের রূপ নেয়।

রাষ্ট্রকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের পৈতৃক সম্পত্তি বানানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো অনুমানের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা লুকিয়ে আছে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলের গভীরে। গণ-অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী ব্যর্থতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

১৯৯০ কিংবা ২০২৪—এ দেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে যে, ভোটের অধিকার হরণ, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আর দমনপীড়নের সংস্কৃতি যখনই সীমালঙ্ঘন করে, তখনই জনমনে বিস্ফোরণ ঘটে। 

রাষ্ট্র যদি সুশাসন, ইনসাফ এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে পারে, তবে আরেকটি অভ্যুত্থানের কোনো প্রয়োজনই পড়বে না।

কিন্তু যদি ক্ষমতার মোহ এবং দমনপীড়নের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসে, তবে ইতিহাস তার নিজের নিয়মেই আবার আবর্তিত হতে পারে। ৫ আগস্টের এই দিনে এটাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা।

আরও পড়ুন