আনচেলত্তির তিন ভুলে বিদায় ব্রাজিলের, জিতল নরওয়ে
পেনাল্টি মিস, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো ও রক্ষণাত্মক ভুল পরিকল্পনায় নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ব্রাজিলের, ইতিহাস গড়ে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ে
ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর সতীর্থদের নিয়ে উল্লাসে মাতোয়ারা আরলিং হালান্ড। ছবি: রয়টার্স
এক নজরে
- গোলদাতা: আরলিং হালান্ড (৭৯, ৯০ মিনিট), নেইমার জুনিয়র (৯০+১০, পেনাল্টি)
- টার্নিং পয়েন্ট: ১৩ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েসের পেনাল্টি মিস
- বল দখল: নরওয়ে ৬৬%, পাসিং ৬৫৩ বনাম ব্রাজিলের ৩১৩
- কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের প্রতিপক্ষ: ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকো
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কার্লো আনচেলত্তি বলেছিলেন, আরলিং হালান্ডকে আটকানো কোনো রহস্য নয়। কিন্তু মাঠের ৯০ মিনিটে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র— নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই হালান্ডের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করল ব্রাজিলের রক্ষণ, আর তাতেই ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হারে ব্রাজিল, যেখানে দুটি গোলই করেছেন হালান্ড। একটি মিস হওয়া পেনাল্টি, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং হালান্ডকে ঠেকানোর মতো কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকা— এই তিন কারণেই মূলত ভেঙে পড়ে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।
যেভাবে হাতছাড়া হল ম্যাচ
খেলার প্রথমার্ধে গোল দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ব্রাজিল। ম্যাচের ১৩ মিনিটে পেনাল্টি পেলেও মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারায়েসের নেওয়া শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ডেডলক ভাঙতে ব্যর্থ হয় সেলেসাওরা। প্রথমার্ধ শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের গতি বাড়ায় নরওয়ে। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে নেন হালান্ড, এরপর নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত করেন তিনি। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি পেয়ে ব্যবধান কমান বদলি নামা নেইমার জুনিয়র, তবে সেই গোল স্রেফ সান্ত্বনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
পুরো ম্যাচে ৬৬ শতাংশ বল দখল আর ৯১ শতাংশ নিখুঁত পাসিং নিয়ে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে নরওয়ে। নরওয়ে ৬৫৩টি পাস দেওয়ার বিপরীতে ব্রাজিল দিতে পেরেছে মাত্র ৩১৩টি পাস, যা স্পষ্ট করে দেয় বল পজিশন ধরে রাখতে ঠিক কতটা ভুগেছে সেলেসাওরা।

আনচেলত্তির যে সিদ্ধান্তগুলো প্রশ্নবিদ্ধ
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচ কার্লো আনচেলত্তি দাবি করেছিলেন, হালান্দকে আটকানো কোনো রহস্য নয় এবং তার ডিফেন্ডারদের এ নিয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু মাঠের চিত্র হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। রক্ষণে নির্দিষ্ট কোনো 'অ্যান্টি-হালান্দ' পরিকল্পনা না রাখা এবং আর্সেনাল ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাই শেষ পর্যন্ত কাল হয় ব্রাজিলের জন্য। ম্যাচের শেষভাগে নরওয়ে কাউন্টার-অ্যাটাকে উঠলে হালান্ডের গতির সামনে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়ে ব্রাজিলের রক্ষণ।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নরওয়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রথমার্ধে কাউন্টার-অ্যাটাক নির্ভর যে রক্ষণাত্মক কৌশল আনচেলত্তি বেছে নিয়েছিলেন, তা ব্রাজিলের চেনা আক্রমণাত্মক ফুটবলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। লুকাস পাকেতার ইনজুরির কারণে মাঝমাঠে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণে কাসেমিরোর পাশাপাশি আরেকজন এনার্জেটিক মিডফিল্ডারকে শুরু থেকে না খেলানোর সিদ্ধান্তও ভুল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর ফলে মার্টিন ওডেগার্ডের মতো ক্রিয়েটিভ খেলোয়াড় মাঝমাঠে প্রায় অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে যান।
আক্রমণভাগেও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে উইংয়ে অনেক বেশি চওড়া ও ওপরে খেলানোয় নরওয়ের জমাট রক্ষণ ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সময় সঠিক ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন আনতে দেরি করা এবং ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা নেইমারকে প্রথমার্ধ থেকে ব্যবহার না করে একদম শেষ মুহূর্তে নামানোটাও আনচেলত্তির অন্যতম বড় সিদ্ধান্তগত ভুল হিসেবে দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
এই হারের ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নরওয়েকে কখনো হারাতে না পারার সেই পুরোনো মনস্তাত্ত্বিক চাপ— 'নরওয়েজিয়ান জুজু'— আরও দীর্ঘ হলো ব্রাজিলের জন্য।

নরওয়ের ইতিহাস গড়া রাত
এই জয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন মহাকাব্য রচনা করল নরওয়ে। পুরুষ বিশ্বকাপে এবারই প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল দেশটি। এর আগে বিশ্বমঞ্চে নরওয়ের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে শেষ ষোলো পর্যন্ত যাওয়া। কাকতালীয়ভাবে সেই বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল নরওয়ে, যদিও নকআউটের প্রথম ম্যাচেই ইতালির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। দীর্ঘ ২৮ বছর পর একই ব্যবধানে ব্রাজিলকে হারিয়ে, এবার নকআউট থেকে সরাসরি বিদায় করে দিয়ে নিজেদের সর্বকালের সেরা সাফল্য অর্জন করল নরওয়ে।
আরলিং হালান্ডের জন্যও রাতটি ছিল মাইলফলকের। ব্রাজিলের বিপক্ষে জোড়া গোল করে চলতি বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়াল ৭টিতে, যা তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রাখল। জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা এখন ৬২টি।
কোয়ার্টার ফাইনালে অপেক্ষা করছে কে
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড অথবা মেক্সিকো— দুই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই নরওয়ের জয়ের সম্ভাবনা প্রায় সমান-সমান। ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে বিদায় করে হালান্দের নরওয়ে এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত ডার্ক হর্স। তবে ইতিহাস বলছে, দুই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের বিপক্ষেই নরওয়ের রেকর্ড মিশ্র।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২ বারের দেখায় নরওয়ে জিতেছে মাত্র ২টি ম্যাচে, ইংল্যান্ড জিতেছে ৭টিতে, বাকি ৩টি ড্র। তবে হালান্দ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার সুবাদে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের শক্তি-দুর্বলতা ভালোভাবেই জানেন, যা নরওয়েকে কৌশলগত বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
মেক্সিকোর বিপক্ষে ৬ বারের দেখায় নরওয়ে জিতেছে ২টিতে, মেক্সিকো জিতেছে ৩টিতে, ১টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে মেক্সিকোর বিপক্ষে নরওয়ের রয়েছে সুখস্মৃতি— ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল তারা। মেক্সিকোর হাই-প্রেসিং ফুটবলের বিপরীতে নরওয়ের কাউন্টার-অ্যাটাকিং কৌশল সেবারের মতোই বড় অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
