EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষ হল নেইমার-যুগ, ভাঙলেন পেলের রেকর্ড

যে মাঠে ২০১০ সালে অভিষেক হয়েছিল, সেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ১৬ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন নেইমার

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:১০ এএম

অশ্রুসিক্ত বিদায়ে শেষ হল নেইমার-যুগ, ভাঙলেন পেলের রেকর্ড

নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের অপ্রত্যাশিত হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন নেইমার জুনিয়র। সেলেসাওদের জার্সিতে জাদুকরের শেষ মুহূর্তটি ভক্তদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে। ছবি: রয়টার্স

অ অ

এক নজরে

  • ব্রাজিল জাতীয় দল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেন নেইমার
  • ব্রাজিলের হয়ে ১২৯ ম্যাচ, ৮০ গোল (ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা)
  • অভিষেক ও বিদায় দুটোই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (২০১০ ও ২০২৬)
  • পেলের পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান যিনি চার বিশ্বকাপে গোল করেছেন


আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিয়েছেন নেইমার। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ের পরই এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে ১২৯ ম্যাচে ৮০টি গোল করে ব্রাজিলের পুরুষ জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টানলেন তিনি, পেলেকে টপকে যাওয়া যে রেকর্ড আগে থেকেই তার দখলে ছিল।

আবেগঘন কণ্ঠে ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, 'আমি চেষ্টা করেছি। আমার জাতীয় দলের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই, আর এখানেই শেষ করলাম। এখন সব শেষ।'

একই স্টেডিয়ামে শুরু, একই স্টেডিয়ামে শেষ

২০১০ সালের ১০ আগস্ট। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে প্রথমবার মাঠে নেমেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সেই ম্যাচেই গোল করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন নেইমার দ্য সিলভা সান্তোস জুনিয়র।

ঠিক ১৬ বছর পর, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে, সেই একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে তিনি বললেন, 'সব শেষ।' যেখানে শুরু, সেখানেই শেষ— যেন ফুটবলের একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। মাঝে রয়ে গেল ১২৯টি ম্যাচ, রেকর্ড ৮০টি গোল, আর এক বুক না পাওয়ার হাহাকার।

এই ম্যাচেও নেইমার প্রথম একাদশে ছিলেন না। বদলি হিসেবে নেমে অতিরিক্ত সময়ের পেনাল্টি থেকে করা তার একমাত্র গোলটিই ছিল ব্রাজিলের একমাত্র জবাব, যদিও তা হারের ব্যবধান কমানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি। তবে এই গোলটি নেইমারকে একটা বিশেষ কীর্তির মালিক বানিয়েছে—পেলের পর তিনিই দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান পুরুষ ফুটবলার, যিনি চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করলেন।

নেইমারের এই বিদায় কেবল একটি হারের প্রতিক্রিয়া নয়; এটি ফুটবলের এক বিশেষ ঘরানার অবসানও বটে। ডিফেন্ডারদের বোকা বানানো ড্রিবলিং, মাঠে হালকা চালে ছুটে চলা— 'জোগো বনিতো' নামে পরিচিত এই শৈল্পিক ফুটবলের শেষ বড় প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। আধুনিক ফুটবলের কাঠামোবদ্ধ, পরিসংখ্যান-নির্ভর ধারার মধ্যে নেইমার ছিলেন ব্যতিক্রম— একজন খেলোয়াড় যিনি নিয়মের বাইরে গিয়ে খেলাটাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন।

পরাজয়ের গ্লানি ও হতাশা: ম্যাচ শেষে মাঠে বসে কাঁদছেন নেইমার, সতীর্থরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছবি: রয়টার্স 

সান্তোসের হয়ে পেলের পর লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব অর্থাৎ কোপা লিবার্তাদোরেস জিতে বিশ্বমঞ্চে পা রাখেন তিনি। এরপর ব্রাজিলের জার্সিতে পেলেকে টপকে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন।

তবে ক্যারিয়ারে ট্র্যাজেডিও কম ছিল না। ২০১৪ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে জুনিগার সেই ফাউলে ভাঙে তার মেরুদণ্ড, আর তার অনুপস্থিতিতেই জার্মানির কাছে সেই ঐতিহাসিক ১-৭ হার দেখতে হয় ব্রাজিলকে। আবার ২০১৬ রিও অলিম্পিকে জার্মানিকে হারিয়ে ব্রাজিলকে ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণপদক এনে দিয়ে মারাকানায় অমরত্ব পান তিনি।

২০১৭ সালে পিএসজিতে ট্রান্সফারের পর থেকে ইনজুরি বারবার তাড়া করেছে তাকে, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতা কমিয়ে দেয়। সমসাময়িক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হওয়া খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন নেইমার— প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের কঠোরতা থেকে নিজের ক্যারিয়ার বাঁচাতে তাকে প্রতিনিয়ত লড়তে হয়েছে।

তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো নিখুঁত অ্যাথলেট ছিলেন না, মেসির মতো জন্মগত শান্ত জাদুকরও ছিলেন না। তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ— ভুল করেছেন, কেঁদেছেন, সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু প্রতিবার মাঠে নেমে বিনোদন দিতে কার্পণ্য করেননি।

২০২৬ সালের এই বিদায় রাজকীয় নয়, বরং কান্নাভেজা এবং ট্র্যাজিক। ট্রফি ক্যাবিনেটে একটা বিশ্বকাপ ট্রফি কম রইল, কিন্তু কোটি ভক্তের হৃদয়ে নেইমার যে জায়গা তৈরি করেছেন, তা কোনো ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি অনেক কিংবদন্তিকে দেখেছে— পেলে, জিকো, রোনালদিনহো, কাকা। কিন্তু নেইমারের মতো এত চাপ, এত ভালোবাসা আর এত সমালোচনা একসঙ্গে সামলাতে হয়নি হয়তো আর কাউকে।

জাতীয় দল থেকে বিদায়, তবে ক্লাব ফুটবল এখনো বাকি

আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ালেও এখনই মাঠ পুরোপুরি ছাড়ছেন না নেইমার। সৌদি আরবের ক্লাব আল-হিলালে ইনজুরি-জর্জরিত অধ্যায়ের পর ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি ফিরে যান নিজের ঘরের ক্লাব সান্তোস এফসিতে, যেখানে তার চুক্তির মেয়াদ আছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

তবে সমর্থকদের জন্য আরেকটি মন খারাপ করা তথ্যও আছে। ব্রাজিলের এক অনলাইন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেইমার নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি এখন বছরওয়ারি পরিকল্পনা করছেন, এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই হয়তো ফুটবল থেকে স্থায়ীভাবে অবসর নেবেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ফুটবলের পর ক্লাব ফুটবলেও নেইমার-অধ্যায়ের শেষ অঙ্কটা দেখতে হয়তো আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না।

আরও পড়ুন