হরমুজ সংকটের মধ্যে মার্কিন এলএনজির বৃহত্তম ক্রেতা হচ্ছে কাতার
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন এলএনজি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘শেনিয়ার’ এবং অস্ট্রেলিয়ার তেল গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘উডসাইডের’ সাথে বার্ষিক ৭০ লাখ টন সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে মার্কিন এলএনজির বৃহত্তম ক্রেতা হতে যাচ্ছে কাতার।
কাতার এনার্জি হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে এবং সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে তারা মার্কিন এলএনজি সরবরাহের দিকে ঝুঁকছে। ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৃহত্তম ক্রেতা হতে যাচ্ছে।
কাতারএনার্জি মার্কিন প্রতিষ্ঠান শেনিয়ারের সাথে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অধীনে শেনিয়ারের সাবিন পাস এবং কর্পাস ক্রিস্টি রপ্তানি স্থাপনা থেকে বার্ষিক সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টন এলএনজি কেনা হবে। এই সরবরাহ ২০৩১ সালে শুরু হয়ে ২০৫৪ সাল পর্যন্ত চলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কাতারি প্রতিষ্ঠানটি উডসাইড এনার্জির লুইজিয়ানা এলএনজি প্রকল্প থেকেও বার্ষিক ৩০ লাখ টন এলএনজি কেনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে, যা বর্তমানে নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০ বছরের জন্য ফ্রি-অন-বোর্ড ভিত্তিতে এই সরবরাহ ২০৩০ সালে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
কাতারএনার্জির আল-কাআবি বলেন, ‘‘এই অতিরিক্ত আমদানির ফলে কাতারএনার্জি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজির বৃহত্তম ক্রেতায় পরিণত হলো এবং এটি এলএনজির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে আমাদের আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের গোল্ডেন পাস এলএনজি প্রকল্প এবং মার্কিন এলএনজি ক্রয়ের এই বর্ধিত পোর্টফোলিও এলএনজি শিল্পে কাতারএনার্জির নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করবে এবং আমাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যকরণ কৌশলকে সমর্থন করবে।’’
উল্লেখ্য, এই দশকের শুরুর দিকেই কাতারকে টপকে শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এ পরিস্থিতির মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে সঙ্গে ইরানের দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে কাতারের ওপর নেমে আসা চরম বিপর্যয়। অথচ এই দশকের বাকি সময়ের জন্য কাতারের এলএনজি সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কেবল যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর সংকট, যা এখনও কাতারের এলএনজি রপ্তানির সিংহভাগ অবরুদ্ধ করে রেখেছে, তা দেশটির সমস্ত পরিকল্পনা ওলটপালট করে দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি গত মার্চ মাসে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের এলএনজি স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কাতারএনার্জি সেসময় জানিয়েছিল, ওই হামলায় কাতারের রপ্তানি সক্ষমতার ১৭% ধ্বংস হয়ে যায় এবং এতে আনুমানিক বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হয়।
সাত মাস পর, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে কাতার হ্রাসকৃত সক্ষমতাতেও যে পরিমাণ এলএনজি উৎপাদন করতে পারত, তা বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কাতার নামমাত্র কার্গো পাঠাতে পারছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কাতারএনার্জি কিছু দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত অনিবার্য বা নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত পরিস্থিতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
হঠাৎ করেই কাতার বিক্রি করতে না পারা গ্যাসের কারণে হাজার হাজার কোটি ডলারের লোকসানের মুখোমুখি হয়েছে। তার চেয়েও বড় কথা, একটি নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী দেশ হিসেবে কাতারের যে ভাবমূর্তি ছিল, তা বড় ধাক্কা খেয়েছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে এলএনজি কার্গো চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ থাকায়, কাতারি রাষ্ট্রীয় জ্বালানি জায়ান্ট গত সপ্তাহে এশিয়া ও ইউরোপে এলএনজি সরবরাহের ওপর 'ফোর্স মেইজেউর'-এর মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করেছে।
তেলের মতো এলএনজি রপ্তানিকারকরা পাইপলাইনের মাধ্যমে এই জ্বালানি পরিবহন করতে পারে না বলে গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিলেন কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী এবং কাতারের জ্বালানি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাআবি।
তিনি বলেন, ‘‘বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে আমরা বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’
এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি পুনরায় শুরু করার বিষয়ে এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ‘‘হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কাতার স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে প্রস্তুত।’’
আমরা যখন হরমুজ সংকটের নবম মাসে পদার্পণ করছি, কাতার এমন একটি পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহারের সুযোগ চিরতরে বদলে যেতে পারে।
বাজারে যাওয়ার একমাত্র পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায়, কাতার গত মাসে মার্কিন উৎপাদকদের কাছ থেকে এলএনজি কেনার জন্য দুটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে নিজেদের সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা নিয়েছে।
আপাতত হরমুজ প্রণালীকে ব্যবহারের বাইরে ধরে নিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে সংকটের অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে, কাতার তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্যাস নিয়ে তাদের এলএনজি সরবরাহের বিকল্পগুলো বাড়াচ্ছে।
কাতার ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উডসাইডের সাথে এই চুক্তি বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকার প্রতি কাতারএনার্জির অবিচল আস্থা এবং একটি নমনীয়, বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক এলএনজি পোর্টফোলিও গড়ে তোলার কৌশলের প্রতিফলন।
কারণ ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের বাজারে প্রাপ্যতা এবং নির্ভরযোগ্যতা— উভয় দিক থেকেই আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
