জ্বালানি তেল-গ্যাস সরবরাহের নতুন কেন্দ্রে আফ্রিকা
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
২ হাজার কোটি ডলারের ‘মোজাম্বিক এলএনজি’ লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা। ছবি: দ্য আফ্রিকা রিপোর্ট।
মধ্যপ্রাচ্যের চিরন্তন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্ববাজারের জ্বালানি সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরের তেল-গ্যাসের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন হন্যে হয়ে বিকল্প খুঁজছেন। ঠিক এই জায়গাতেই নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান ও খনিজ সম্পদের প্রভাবে সামনে এসেছে আফ্রিকা মহাদেশ।
হরমুজ প্রণালির সামরিক সংঘাত কিংবা নৌ-পরিবহনের যেকোনো অচলাবস্থা বিশ্ববাজারে মুহূর্তেই জ্বালানি সংকট তৈরি করে। কিন্তু আফ্রিকার আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরীয় দীর্ঘ উপকূলীয় প্রকল্পগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো হরমুজ প্রণালির মতো সংবেদনশীল রুটকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে সরাসরি জ্বালানি পৌঁছে দিতে পারে। এই এক ভৌগোলিক সুবিধাই আফ্রিকাকে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন কেন্দ্রে পরিণত করছে।
জ্বালানি খাতের আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, আফ্রিকার হাইড্রোকার্বন খাতে বিনিয়োগের এক নতুন স্বর্ণযুগ শুরু হতে যাচ্ছে। ফিচ সলিউশনসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৪ সালের মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি প্রায় ১৭৫ শতাংশ বাড়বে।
২০২৪ সালে অঞ্চলটি থেকে ৩ হাজার ৫৭০ কোটি ঘনমিটার এলএনজি রফতানি হয়েছিল। ২০৩৪ সালে তা ৯ হাজার ৮০০ কোটি ঘনমিটারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ‘স্টেট অব আফ্রিকান এনার্জি ২০২৭ আউটলুক’ জানাচ্ছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন খাতে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হবে।
এই নতুন বিনিয়োগের হাত ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে মহাদেশটির দৈনিক হাইড্রোকার্বন উৎপাদন ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল (তেলসমতুল্য) স্পর্শ করতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি জায়ান্টগুলো যেমন- টোটালএনার্জিস, এক্সনমবিল, শেল, ইকুইনর এখন আফ্রিকার একাধিক দেশে বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
দেশটির কাবো দেলগাদো উপকূলের রোভুমা অববাহিকা এখন আকর্ষণের মূল কেন্দ্র। সেখানে ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি ‘টোটালএনার্জিস’ বন্ধ হয়ে যাওয়া ২ হাজার কোটি ডলারের ‘মোজাম্বিক এলএনজি’ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুনরায় পুরোদমে শুরু করেছে। যার লক্ষ্য ২০২৯ সালের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি মার্কিন এক্সনমবিলের ৩ হাজার কোটি ডলারের প্রকল্প এবং ইতালীয় এনির ৭২০ কোটি ডলারের ‘কোরাল নর্থ’ প্রকল্প মোজাম্বিককে এলএনজির পরাশক্তিতে রূপান্তর করছে।
আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি দেশ নাইজেরিয়া ‘ডিকেড অব গ্যাস’ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার চালাচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ৩ কোটি টনে উন্নীত করার জন্য তারা ‘ট্রেন-৭’ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
সেনেগাল ও মৌরিতানিয়া এই দুই দেশের যৌথ ‘গ্রেটার টর্তু আহমেইম’ মেগা প্রজেক্ট থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম এলএনজি চালান সফলভাবে রফতানি করা হয়েছে।
তানজানিয়ায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের এলএনজি প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে নামিবিয়ার অরেঞ্জ অববাহিকায় আবিষ্কৃত নতুন তেল ক্ষেত্র ‘ভেনাস’ ও ‘মোপানে’ ঘিরে বিশ্ববাজারে বিপুল আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
আফ্রিকা এখন আর শুধু কাঁচামাল রপ্তানিকারক অঞ্চল হয়ে থাকতে রাজি নয়। পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে মহাদেশটির নিজস্ব গ্যাসের চাহিদা ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে সাব-সাহারান আফ্রিকায় প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র ১৭ শতাংশ আসে গ্যাস থেকে, যেখানে বৈশ্বিক গড় ২৫ শতাংশ।
ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিজস্ব শিল্পায়নের চাকা ঘোরাতে আফ্রিকার দেশগুলো এখন উত্তোলিত গ্যাসের একটা বড় অংশ নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারে ধরে রাখার কৌশল নিচ্ছে।
এই চোখ ধাঁধানো সম্ভাবনার বিপরীতে আফ্রিকাকে বেশ কিছু কাঠখড়ও পোড়াতে হচ্ছে। স্থানীয় সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেক সময় প্রকল্পের গতি থামিয়ে দেয়। যেমনটি মোজাম্বিকে হয়েছিল।
দুর্বল অবকাঠামো, জটিল ও দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং মূলধনের উচ্চ ব্যয় এখনও বড় বাধা। বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তরের যে চাপ রয়েছে, তা এই দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে কিছুটা অনিশ্চয়তায় ফেলছে।
চ্যালেঞ্জ যতই থাকুক না কেন, হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী জ্বালানি উৎসের খোঁজে বিশ্ব এখন আফ্রিকার দিকেই ঝুঁকছে। চলমান প্রকল্পগুলো যদি সময়মতো আলোর মুখ দেখে, তবে আগামী এক দশকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও তেল-গ্যাস বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ মধ্যপ্রাচ্যের হাত থেকে অনেকটাই আফ্রিকার উপকূলে স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছে।
Recommended Stories
