মার্কিন বলয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকির আশংকা
ভারতসহ ৪টি দেশকে কেন হরমুজের নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিল ইরান?
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১১ পিএম
ছবি: আল- জাজিরা
ভারত, চীন, ইরাক এবং কাতার—এই চারটি দেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে ইরান। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরান একদিকে যেমন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাঝেও নিজেদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারবে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাপকে দুর্বল করতে পারবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইরানের সংসদীয় কমিটির এক শীর্ষ নেতা এই অব্যাহতির তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন।
ইরানি সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান আমির হায়াত মোকাদ্দেম ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে (আইএসএনএ) বলেন, ‘‘এই দেশগুলোর জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারছে এবং মার্কিন বাহিনীও তাদের পথরোধ করছে না।’’
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান—যুক্তরাষ্ট্র—ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই ইরান এই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোর ওপর নৌ—অবরোধ আরোপ করে।
এতে এখনও পর্যন্ত বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১.৬% বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯.৮৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
হায়াত মোকাদ্দেমের তথ্যমতে, এই ছাড়ের বিনিময়ে ইরান ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাবে। কাতার ইতিমধ্যে ইরানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে এবং যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছে।
এছাড়া, ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে ইরান ট্রানজিট ফি (টোল) আদায় করবে, তবে কাতারের জাহাজগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চলাচলের সুবিধা পাবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো টোল নেওয়া হবে কি না তা তিনি স্পষ্ট করেননি।
ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি তেহরানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চীনই হলো ইরানের অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, যা ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে।
জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এই চারটি দেশই হরমুজ প্রণালির ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল। অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘কেপলার’—এর তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে পারস্য উপসাগর দিয়ে পরিবাহিত তেলের ৪২ শতাংশ চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে গেছে।
লুন্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক রোজবে পার্সি বলেন, “ভারতের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল বন্ধ হওয়া এক বিরাট ক্ষতি ছিল। এছাড়া ভারত এমন কিছু জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করে যা ইরান নিজে উৎপাদন করতে পারে না।”
অন্যদিকে কাতারের জন্য ইরানের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তারা ভৌগোলিকভাবে অনিবার্য প্রতিবেশী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দেশগুলোর জন্য এই অব্যাহতির যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে মার্কিন বলয়ের সাথে রাজনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা।
এ পদক্ষেপের মাধ্যমে মার্কিন বলয় ভাঙা যাবে কীনা তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আগেই জানিয়েছে যে, তাদের অবরোধ ইরানের উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করা বা বের হওয়া সকল দেশের জাহাজের জন্যই প্রযোজ্য, তবে মানবিক সাহায্য (খাদ্য ও ওষুধ) পরিদর্শনের পর ছাড় দেওয়া হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ওয়াশিংটন ইরানের এই নতুন সিদ্ধান্ত মেনে নেয়, তবে মার্কিন নৌ—অবরোধের কার্যকারিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমানে কাতার—মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা মূলত ইরানের একটি প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, যেখানে বলা হয়েছে— আমেরিকা যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ ইরানের ৭টি শর্ত মেনে নেয়, তবেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে।
সূত্র: আল জাজিরা
