সরকারের চাপের মুখে বন্ধ হচ্ছে রাশিয়ার শীর্ষ অনুসন্ধানী পত্রিকা
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
রাশিয়ার শীর্ষ স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সংবাদপত্র ‘নোভায়া গেজেতা’ চূড়ান্তভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে
রাশিয়ার সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর লাগাতার আইনি ও মানসিক চাপের মুখে দেশটির অন্যতম শীর্ষ স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সংবাদপত্র ‘নোভায়া গেজেতা’ চূড়ান্তভাবে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।
পত্রিকাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ এই বিদায়কে অত্যন্ত বেদনাদায়ক উল্লেখ করে বলেন, “কাউকে হত্যা করার অনেক উপায় আছে। তারা আমাদের সরাসরি বন্ধ না করে আইনি বেড়াজালে শ্বাসরোধ করে মারার পথ বেছে নিয়েছে।”
সম্পাদকীয় দলের অভিযোগ, ক্রেমলিন এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রথমে তাদের ওয়েবসাইট ব্লক করে, তারপর ছাপা সংস্করণের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে এবং সর্বশেষ গণমাধ্যম হিসেবে এর লাইসেন্স ও নিবন্ধন বাতিল করে।
আরও পড়ুন
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রেমলিনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কাজ করা এই ঐতিহাসিক পত্রিকাটি আগামী ৯ নভেম্বর তাদের কার্যালয় ছেড়ে দেবে। একই সাথে বন্ধ করবে তাদের নিজস্ব সার্ভার।
বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মস্কোয় পত্রিকাটির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় এক বেদনাবিধুর দৃশ্য। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে পিচবোর্ডের বাক্স ও প্লাস্টিকের ব্যাগ। যাতে গুছিয়ে নেওয়া হচ্ছে ৩০ বছরের পুরোনো স্মৃতি।
কার্যালয়ের একটি বিশেষ কক্ষে সংরক্ষিত ছিল ২০০৬ সালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়া প্রখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক আনা পলিতকভস্কায়ার স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্র। যা অশ্রুসজল চোখে সরিয়ে নিচ্ছেন সহকর্মীরা।
২০২৩ সালে নোবেলজয়ী মুরাতভকে এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পুরো নোভায়া গেজেতা সংস্থাকে রুশ আইন অনুযায়ী ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। এর ফলে পাঠকদের কাছ থেকে অনুদান বা ক্রাউডফান্ডিং নেওয়ার পথও স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পত্রিকাটি চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নোভায়া গেজেতা রাশিয়ার সরকারি স্তরের উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং চেচনিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে একের পর এক সাড়াজাগানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে এই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য তাদের চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত পত্রিকাটির ৬ জন নির্ভীক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। যাঁদের মধ্যে ২০০৬ সালের অক্টোবরে নিজের অ্যাপার্টমেন্টের লিফটে গুলিবিদ্ধ হওয়া আনা পলিতকভস্কায়া বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর ক্রেমলিন স্বাধীন গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে কঠোর ‘সেন্সরশিপ আইন’ পাস করে। সেই সময় জীবন বাঁচাতে পত্রিকাটির একাংশ সাংবাদিক লাটভিয়ায় পালিয়ে গিয়ে ‘নোভায়া গেজেতা ইউরোপ’ নামে একটি ভিন্ন সংস্করণ চালু করেন, যা এখনো নির্বাসন থেকে কাজ করছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে পত্রিকাটির মস্কো কার্যালয়ে আকস্মিক হানা দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য বেআইনিভাবে সংগ্রহের অভিযোগে প্রবীণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ওলেগ রলদুগিনকে গ্রেপ্তার করে রুশ পুলিশ। এরপর বর্তমান প্রধান সম্পাদক সের্গেই সোকোলভের বাড়িতেও গভীর রাতে তল্লাশি ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এই একের পর এক আগ্রাসী পদক্ষেপের পর রাশিয়ায় বসে সাংবাদিকতা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। নিজেদের বিদায়ী বিবৃতিতে নোভায়া গেজেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমান রাশিয়ায় মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করাকে রাষ্ট্র এখন অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে।
তবে নোবেলজয়ী দিমিত্রি মুরাতভ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “কার্যালয় বন্ধ হলেও আমাদের মূল্যবোধ মরে যাবে না। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার যেকোনো রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতার চেয়ে অনেক বড়।”
নোভায়া গেজেতার এই মহাপ্রয়াণকে পুতিনের রাশিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে দেখছেন বৈশ্বিক বিশ্লেষকেরা।
