রয়টার্সের প্রতিবেদন
ডিসেম্বরের আগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম
রয়টার্স
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশে চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে অক্টোবর মাসেই ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের যেকোনো একক মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের আগে এই প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৮ জনে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হলেও অক্টোবর মাসে সেই রেকর্ড ভেঙে ১৭৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
দেশের এই ডেঙ্গু সংকটের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক হাম রোগের প্রাদুর্ভাবও চলছে, যাতে এ বছর ১,২০০-এর বেশি মানুষ মারা গেছে। যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে।
চাপের মুখে হাসপাতালগুলো: দেরিতে ভর্তিতে বাড়ছে ঝুঁকি
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক মির্জা গোলাম সারওয়ার জানান, হাসপাতালে আসা অনেক ডেঙ্গু রোগীই একদম শেষ মুহূর্তে বা ‘শক সিন্ড্রোম’ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন। রোগীদের রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পর তারা হাসপাতালে আসছেন।
দেশখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া এবং রোগ নির্ণয়ে বিলম্বের কারণেই এবার মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যারা আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের পরবর্তীতে নতুন সেরোটাইপে সংক্রমণ হলে জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপই সক্রিয় থাকায় এবং কোনো কার্যকর ডেঙ্গু ভ্যাকসিন চালু না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
ঢাকার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী ফয়সাল ফেরদৌস ২০১৭, ২০২৪ এবং আবারও এই মাসের শুরুতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। বর্তমানে বাড়িতে থেকে সুস্থ হতে থাকা ফেরদৌস বলেন, ‘‘এবার আমার এবং আমার স্ত্রী- উভয়েরই হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল।’’
ফেরদৌস জানান, তাঁদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে অন্য একটি অসুস্থতার জন্য বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরপরই তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘‘প্রতিটি দফাই অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল, আর বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর মারাত্মক অসুস্থতার ঝুঁকি নিয়ে আপনার ভেতরে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।’’
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের সক্রিয়তা গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি স্ট্রেন বা ধরণ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি পরবর্তীতে অন্য আরেকটি ধরণ দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন, যা জটিলতার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ এখনো কোনো ডেঙ্গু ভ্যাকসিন চালু করেনি, যদিও কর্তৃপক্ষ দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা হিসেবে একটি ভ্যাকসিনের কথা বিবেচনা করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ডেঙ্গুর মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করছে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, অক্টোবরের গতিতে মৃত্যু বাড়তে থাকার সম্ভাবনা কম, তবে সংক্রমণ সম্ভবত নভেম্বর জুড়েও অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা হয়তো কিছুটা স্বস্তি দেখতে পারি, তবে নভেম্বরে ডেঙ্গু পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। যেকোনো হ্রাসই সম্ভবত সামান্য হবে এবং ডিসেম্বরের আগে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম।’’
বাশার জানান, ‘‘আগের বৃষ্টিপাতের ফলে তৈরি হওয়া প্রজননস্থল থেকে মশার জন্ম নেওয়া অব্যাহত থাকবে, যার ফলে আবহাওয়া শুষ্ক হতে শুরু করলেও সংক্রমণ বজায় থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে আংশিকভাবে জড়িত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনশীল ধরণ মশার প্রজনন মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করছে এবং এডিস মশাকে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রাখছে।’’