প্রতিদিন প্রকাশিত হয় ৫৮৫টি পত্রিকা, পাঠকের দুয়ারে পৌঁছায় কয়টি?
পাঠকের ১০-১২টির বেশি নাম জানা নেই
দেশে নিবন্ধিত দৈনিক পত্রিকা ৫৮৫টি হলেও, বাজারে নিয়মিত দেখা মেলে হাতে গোনা কয়েকটির। ছবি: প্রতীকী
সরকারি তালিকায় দেশে নিবন্ধিত দৈনিক পত্রিকাই আছে প্রায় ৫৮৫টি। এছাড়া সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৯৬৯টি নিবন্ধিত গণমাধ্যম রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে বহুল পরিচিত মূলধারার জাতীয় দৈনিকের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি।
তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএফপির তালিকায় শত শত পত্রিকার নাম থাকলেও প্রশ্ন ওঠে—এর কয়টি প্রতিদিন সকালে পাঠকের দুয়ারে পৌঁছায়? আর প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যে হকাররা পত্রিকা বিক্রি করেন, তাদের ঝুড়িতেই বা কয়টি পত্রিকা জায়গা পায়?
পাঠকের ১০-১২টির বেশি নাম জানা নেই
পত্রিকা শিল্পের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো এর বিপুল সংখ্যা এবং সাধারণ পাঠকের সীমিত পরিচিতি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দুটি পত্রিকা পড়েন। তাকে দেশে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা জিজ্ঞেস করতেই কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, ‘প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, যুগান্তর, সমকাল, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ আর ইংরেজি ডেইলি স্টার— এগুলোই তো নিয়মিত দেখি। সব মিলিয়ে বড়জোর ১০-১২টা পত্রিকার নাম বলতে পারব। এর বাইরে নাকি আরও শত শত পত্রিকা আছে, কিন্তু সেগুলো তো কখনো বাজারে দেখি না।’
এত পত্রিকা, কিন্তু হকার বেচেন কয়টি?
ফার্মগেটের প্রবীণ হকার জয়নাল আবেদীন (ছদ্মনাম) জানান, ‘নিবন্ধন নেওয়া পেপার কয়েক শত থাকলেও আমার ব্যাগে ২০টির বেশি থাকে না। মানুষ চেনে আর কেনে ৫-৬টি। বাকিগুলো অফিস বা চায়ের দোকানের জন্য দু-এক কপি করে নেওয়া লাগে। যে পেপার বিক্রি হবে না, তা ব্যাগে নিয়ে ওজন বাড়াব কেন?’
বাস্তবতা হলো, একজন হকার গড়ে ১৫-২০টি পত্রিকা বিক্রি করেন, যার ৮০ শতাংশই দখল করে রাখে শীর্ষ ৪-৫টি দৈনিক। বাকি শত শত পত্রিকা হকাররা ছুঁয়েও দেখেন না।
তাহলে বাকি পত্রিকা যায় কোথায়?
এখানেই লুকিয়ে গল্পের আসল অংশ। বাজারে চাহিদা না থাকলেও পত্রিকার ডিক্লারেশন কেন এত বেশি? মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষ ও হকারদের সঙ্গে কথা বলে তিনটা কারণ পাওয়া গেল।
কিছু পত্রিকা সাধারণ পাঠকের জন্য ছাপাই হয় না। এগুলো টিকে থাকে শুধু সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন আর আইনি নোটিশ পাওয়ার জন্য। কখনো ছাপা হয় মাত্র কয়েকশ কপি।
কিছু পত্রিকা টিকে থাকে অন্য সুবিধার জন্য। ডিক্লারেশন থাকলে সাংবাদিকদের সরকারি প্রেস কার্ড পাওয়া সহজ হয়। শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানির সুযোগও থাকে। তাই অনেক পত্রিকা বছরের পর বছর নামমাত্র টিকে থাকে।
আর কিছু পত্রিকা যায় সরাসরি সরকারি দপ্তরে, সচিবালয়ে, নেতাদের অফিসে। সাধারণ মানুষের বাসায় এগুলো কখনো পৌঁছায়ই না।
সংকট ও মফস্বলের ভিন্ন চিত্র
ডিজিটাল মিডিয়ার বিপ্লব ও কাগজের মূল্যবৃদ্ধিতে ছাপা পত্রিকা পড়ার অভ্যাস এমনিতেই কমছে। ফলে হকাররা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে ঢাকার বাইরের চিত্র কিছুটা আলাদা। জেলা বা মফস্বল শহরে করপোরেট পত্রিকার পাশাপাশি স্থানীয় ৫-৭টি আঞ্চলিক পত্রিকা ভালো বিক্রি হয়। গ্রামীণ সংকট ও স্থানীয় খবর তুলে ধরায় এসব পত্রিকা এখনো টিকে আছে এবং হকারদের জীবিকার কিছুটা জোগান দিচ্ছে।
কাগজে-কলমে পত্রিকার সংখ্যা শিল্পের বিশালতা দেখালেও হকারের শূন্য ব্যাগ প্রমাণ করে— কেবল সরকারি নিবন্ধনই পত্রিকার আসল শক্তি নয়। পাঠকপ্রিয়তা ও বস্তুনিষ্ঠতা ছাড়া শত শত পত্রিকা মূলত কাগজের অপচয় বৈ কিছু নয়।
