EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

এআই-ফেসবুকের যুগেও মানুষ কেন প্রিন্ট পত্রিকা পড়ে?

ডিজিটাল স্রোতেও কমেনি প্রিন্ট পত্রিকার কদর—সত্য জানার তাগিদ, নাকি ছাড়তে না পারা এক অভ্যাস

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম

এআই-ফেসবুকের যুগেও মানুষ কেন প্রিন্ট পত্রিকা পড়ে?

অনলাইনের যুগেও এক কাগজে বুঁদ নানা বয়সের মানুষ—সংবাদপত্রের প্রতি মানুষের চিরন্তন আস্থা ও কৌতূহলের প্রতিচ্ছবি। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

এখন রাত। কয়েক ঘণ্টা পরই ভোর হবে। মানুষ আবার ব্যস্ত হয়ে উঠবেন দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে। বেড়ে যাবে হকারদের ব্যস্ততা, দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে যাবে খবরের কাগজ। আর যাঁদের পত্রিকা না পড়লে দিন শুরুই হয় না, তাঁরা তখন মগ্ন হবেন পত্রিকার পাতা ওল্টাতে।

আজকের ডিজিটাল যুগে—যেখানে ফেসবুক, গুগল, ইন্টারনেট এবং এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় চলে আসে, সেখানে টাকা খরচ করে পরের দিন বাসি পত্রিকা কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে প্রিন্ট পত্রিকা টিকে থাকার এবং মানুষের তা কিনে পড়ার পেছনে রয়েছে গভীর কিছু মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং কাঠামোগত কারণ—যা শুধু অভ্যাস নয়, বরং এক ধরনের প্রয়োজনীয়তা।

অনলাইন বা এআই আপনাকে দ্রুত জানাবে ‘কী ঘটেছে’। কিন্তু প্রিন্ট পত্রিকা পরের দিন সকালে আপনাকে জানাবে ‘কেন ঘটেছে’ এবং ‘এর প্রভাব কী’। পত্রিকার সম্পাদকীয়, বিশেষ নিবন্ধ, এবং বিশেষজ্ঞদের কলামের যে গভীরতা, তা স্ক্রোল করতে করতে পড়া চটজলদি নিউজে পাওয়া যায় না।

সকালের এক কাপ চা আর হাতে এক তাজা খবরের কাগজ—কয়েক দশক ধরে বাঙালির চেনা সকালের এই সমীকরণটি আজও বদলে যায়নি। যেখানে স্মার্টফোনের এক ক্লিকে বা এআই প্রযুক্তির মুহূর্তের স্ক্রলিংয়ে মিলছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব খবর, সেখানে কাগজের গন্ধ শুঁকে ‘বাসি খবর’ পড়ার এই অভ্যাস কেন এখনো টিকে আছে? অনলাইনের তীব্র গতির যুগেও প্রিন্ট মিডিয়া বা ছাপা পত্রিকার এই টিকে থাকার লড়াই এবং এর পেছনের মনস্তত্ত্ব এক গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

ডিজিটাল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সংকট হলো ‘ফেক নিউজ’ বা গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া চটকদার খবরের সত্যতা নিয়ে প্রতিনিয়ত সংশয় জাগে। ঠিক এখানেই প্রিন্ট পত্রিকা অনন্য। একটি সংবাদ ছাপা হওয়ার আগে রিপোর্টার, সাব-এডিটর, এবং নিউজ এডিটরের কঠোর স্ক্রিনিং ও যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বশীলতাই কাগজের খবরকে পাঠকের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ফেসবুক ও টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা ব্যাংক খাতের দেউলিয়া হওয়ার মতো অসংখ্য ভুয়া খবর ও ডিপফেক ছবি ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। সাধারণ মানুষ যখন এই ডিজিটাল গুজবে বিভ্রান্ত হন, তখন সত্যতা নিশ্চিত করতে তারা পরদিন সকালে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বা কালের কণ্ঠের মতো মূলধারার প্রিন্ট পত্রিকার প্রিন্ট সংস্করণের ওপর ভরসা করেন। পাঠকদের সাধারণ মন্তব্য—‘ফেসবুকের খবর বিশ্বাস নেই, কাল কাগজে আসুক, তারপর দেখব।’

সকাল থেকে রাত—ল্যাপটপ, ট্যাবলেট আর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আধুনিক মানুষ ক্লান্ত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘ডিজিটাল ফ্যাটিগ’। এই স্ক্রিন লাইটের নীল আলো থেকে চোখকে আরাম দিতে এবং শান্তিতে কোনো বিশ্লেষণধর্মী দীর্ঘ লেখা পড়ার জন্য মানুষ এখনো প্রিন্ট পত্রিকার আশ্রয় নিচ্ছে। কাগজের গন্ধ শুঁকে পাতা ওল্টানোর যে শারীরিক ও মানসিক অনুভূতি তা ডিজিটাল স্ক্রিন কখনোই প্রতিস্থাপন করতে পারে না। কাগজ স্পর্শ করার স্পর্শানুভূতি বা ‘ট্যাকটাইল সেন্স’ মানুষের পড়ার আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইন্টারনেটে পড়ার সময় পপ-আপ বিজ্ঞাপন, নোটিফিকেশন বা চ্যাটের কারণে মনোযোগ বারবার নষ্ট হয়। প্রিন্ট পত্রিকা মানুষকে কোনো বাধা ছাড়াই শান্ত মাথায় পড়ার সুযোগ দেয়।

দেশের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিক, অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী এবং নীতিনির্ধারকেরা সকালের পত্রিকা ছাড়া দিন শুরু করতে পারেন না। অফিস, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি এবং চায়ের দোকানে এখনো প্রতিদিন পত্রিকা রাখা একটি নিয়মিত সংস্কৃতি ও সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি বা রিডিং রুমে গেলে চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। বিসিএস বা কর্পোরেট চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া তরুণরা নিয়ম করে পড়েন দুটি পত্রিকা—একটি বাংলা, আরেকটি ইংরেজি।

সম্প্রতি সরকারি ব্যাংক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ফাহিম আহমেদের কথায়, অনলাইনে স্ক্রল করলে মেলে কেবল শিরোনাম, কিন্তু লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভায় দরকার গভীর জ্ঞান। তাঁর ভাষায়, নিয়মিত প্রিন্ট পত্রিকা পড়ার অভ্যাস আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ে ধারণা স্পষ্ট করে দেয়—বিশেষ করে ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতা বিসিএস ও বহুজাতিক কোম্পানির ভাইভায় এগিয়ে রাখে অন্যদের চেয়ে। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে তাই জেনারেশন-জেড তরুণদের কাছেও প্রিন্ট পত্রিকার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে, কমছে না।

অনলাইন পোর্টালগুলো মূলত ‘ব্রেকিং নিউজ’ বা দ্রুত খবর পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে। সেখানে খবরের বিস্তার থাকে কম। পক্ষান্তরে, প্রিন্ট পত্রিকা ঘটনার পেছনের গল্প, গভীর বিশ্লেষণ, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন উপহার দেয়। পাঠক কেবল ঘটনাটি কী তা জানতে চান না, বরং কেন এবং কীভাবে ঘটল—তা বিস্তারিত বুঝতে এখনো কাগজের পাতাতেই ভরসা রাখেন।

বহু মানুষের কাছে সকালবেলা খবরের কাগজ হাতে নেওয়াটা কেবল তথ্য জানার মাধ্যম নয়, এটি একটি লাইফস্টাইল বা আভিজাত্যের অংশ। প্রবীণদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস তো বটেই, এমনকি নতুন প্রজন্মের অনেক পাঠকও সকালের সময়টাকে একটু শান্ত ও প্রযুক্তিমুক্ত রাখতে কাগজের পাতা ওল্টানো পছন্দ করছেন।

মফস্বল শহর বা প্রত্যন্ত গ্রামের বাজারগুলোতে সকালের আলো ফোটার পরেই এক চেনা চিরন্তন দৃশ্য চোখে পড়ে। গ্রামের প্রবীণ ও বয়স্ক ব্যক্তিরা, যাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস খবরের কাগজ পড়া, তারা সকাল হলেই একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন মেনে ছুটে যান স্থানীয় বাজারের দিকে। বাজারের যেকোনো একটি পরিচিত চায়ের দোকানে বসে এক কাপ গরম চা আর হাতে একটি প্রিন্ট পত্রিকা—এটিই তাদের দিনের সেরা সময়। 

সেখানে কেবল একলা পড়া নয়, বরং পত্রিকার একেকটি পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে চলে রাজনীতি, সমাজ আর সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে পরিচিতদের সাথে তুমুল আড্ডা নিত্যদিনের চেনা রূপ। অনেকে আবার পছন্দের পত্রিকাটি কিনে পরম যত্নে বাড়ি নিয়ে আসেন। সারাদিনের অবসর কাটে সেই কাগজের পাতায় চোখ বুলিয়ে। চশমার ফাঁক দিয়ে পত্রিকার সেই ছোট ছোট কালো অক্ষরগুলো যখন তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন তা যেন এক অদ্ভুত আলোড়নে তাদের মনকে সমৃদ্ধ করে।

শুধু প্রবীণরাই নন, গ্রামীণ বাজারের মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান বা সেলুনেও প্রতিদিন নিয়ম করে রাখা হয় প্রিন্ট পত্রিকা। সকালের গ্রামীণ বাজার এভাবেই খবরের কাগজের হাত ধরে এক প্রাণবন্ত ও ব্যস্ত রূপ ধারণ করে, যা ডিজিটাল স্ক্রিন বা সোশ্যাল মিডিয়া কখনো ছুঁতে পারবে না।

ডিজিটাল বিজ্ঞাপন চোখের পলকে হারিয়ে যায়, কিন্তু পত্রিকার পাতায় দেওয়া একটি বিজ্ঞাপন পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নোটিশ, আইনি বিজ্ঞপ্তি এবং ঐতিহাসিক ঘটনার আর্কাইভ হিসেবে প্রিন্ট সংস্করণের গ্রহণযোগ্যতা এখনো অপরিসীম।

প্রযুক্তি হয়তো খবরের মাধ্যমকে বদলে দিয়েছে, কিন্তু খবরের প্রতি মানুষের তৃষ্ণাকে বদলাতে পারেনি। রেডিও আসার পর ভাবা হয়েছিল পত্রিকা বন্ধ হবে, টেলিভিশন আসার পর ভাবা হয়েছিল রেডিও-পত্রিকা দুটিই হারাবে—কিন্তু কোনোটিই বিলুপ্ত হয়নি। ঠিক তেমনি, এআই এবং অনলাইনের তীব্র স্রোতের মাঝেও প্রিন্ট পত্রিকা নিজের ঐতিহ্য, গভীরতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার জোরে আরও বহুদিন তার নিজস্ব কদর বজায় রাখবে।

আরও পড়ুন