ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া ও সরকারের সমন্বয়ে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান সম্ভব: মাহ্দী আমিন
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া ও সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয়ের বিকল্প নেই।
শিক্ষাদান, গবেষণা কিংবা যেকোনো প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যার সমাধান। বর্তমানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি পণ্য, পরামর্শক ও আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অথচ দেশের মেধাবীদের কাজে লাগিয়ে এসব সমস্যার স্থানীয় সমাধান বের করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) যৌথ উদ্যোগে ‘শিল্প ও একাডেমিয়ার সংযোগ: ব্যবসায়িক উদ্ভাবনের দিকে এআই-এর রূপান্তর’ শীর্ষক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্ভাবনী উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সরকার বিভিন্ন স্টার্টআপ তহবিল ও অনুদানের ব্যবস্থা করছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদেরও প্রাথমিক মূলধন দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি টেকসই জাতীয় শিল্প বলয় গড়ে তোলা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই সরকারের মূল লক্ষ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য নয়। দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
যানজট নিরসন, কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর মতো সমস্যার স্থানীয় সমাধানে একাডেমিয়া ও শিল্প খাতকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, উদ্ভাবনী সমাধান শুধু ঢাকার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই আসতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ঢাকার বাইরেও অনেক শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছেন। সেখান থেকেও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ গড়ে উঠছে। এ জন্য জেলা পর্যায়ে স্থানীয় ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর যোগসূত্র তৈরি করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও মেশিন লার্নিংয়ের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রযুক্তির পরিবর্তনে কিছু প্রচলিত কর্মসংস্থান কমলেও ডেটা অ্যানোটেশন থেকে শুরু করে এআই অ্যাপ্লিকেশন পর্যন্ত নতুন অনেক কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
শিক্ষাক্রমকে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে পারলে তরুণদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। প্রযুক্তি ব্যবহারে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে তা মানবকল্যাণে কাজে লাগানোই সরকারের লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা ব্যবস্থাসংক্রান্ত দুটি মৌলিক লক্ষ্য তুলে ধরেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, প্রথমত, শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাদের মধ্যে নীতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও মানবিক মর্যাদাবোধ থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের এমন পেশাগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন।
সবাইকে প্রথাগতভাবে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা গবেষক হতে হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকের ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ দক্ষতা থাকতে পারে। এ লক্ষ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা ও ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
মেধা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে প্রতিটি নাগরিকের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা বিকশিত করাই সরকারের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেইন’ প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের অনেক প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিভিন্ন বিষয়ের মেধাবী ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করছেন। তারা সেখানকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। এতে প্রমাণ হয়, দেশে মেধার সংকট নেই। সংকট হলো, তাদের মেধা বিকাশের উপযুক্ত সুযোগ ও কর্মপরিবেশ তৈরি করতে না পারা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ‘ব্রেন ড্রেইন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, মেধাবীরা বিদেশে অবস্থান করলেও যেন বাংলাদেশের অগ্রগতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন, সরকার সেই সুযোগ তৈরি করবে।
নতুন এই ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রবাসী উদ্যোক্তারা যাতে সহজে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং গবেষক ও শিক্ষকেরা দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা করতে পারেন, সেই পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল শিক্ষাবিদেরা যাতে দেশে ফিরে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেন, সে জন্যও শক্তিশালী কর্মপরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে সরকার।
মাহ্দী আমিন বলেন, তরুণ প্রজন্মের প্রাণশক্তি, উদ্দীপনা ও মেধা দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সময়ে বিপুল যুবশক্তিকে উপযুক্ত নীতি ও প্রণোদনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
তরুণদের প্রত্যাশা ধারণ করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের মতো সরকারের অন্যান্য বিভাগও যৌথ উদ্যোগে নীতিমালা সংস্কার ও বাস্তবায়নে কাজ করবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্লাক্সের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন, বুয়েটের শিক্ষার্থী ও নেভোলিনের সিইও মো. রাহিনুর রহমান, আইইউটির শিক্ষার্থী ও অ্যান্টসের সিইও তৌসিফ ইসলাম এবং এআইইউবির সিএসই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ মৃধা।
