EN ☀️
×

Follow Us

বাংলাদেশ

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আবারও সুন্দরবনে ফিরছে সেই ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’

চোরাশিকারিদের ফাঁদ থেকে উদ্ধারের সাড়ে ৫ মাস পর সুস্থ বাঘিনী; জুনের শেষেই নিজের আবাসে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত বন বিভাগের

ডেইলি সান রিপোর্ট, বাগেরহাট

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আবারও সুন্দরবনে ফিরছে সেই ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে চোরাশিকারিদের প্রাণঘাতী ফাঁদ থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাসের নিবিড় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে চলতি জুন মাসের শেষভাগেই বাঘিনীটিকে তার চিরচেনা আবাসস্থল সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের মোংলা উপজেলার বনের শাপলার খাল সংলগ্ন বৈরাগী বাড়ির কাছে চোরাশিকারিদের পেতে রাখা ফাঁদে আটকে পড়েছিল এই পূর্ণবয়স্ক বাঘিনীটি। খবর পেয়ে ৪ জানুয়ারি বন বিভাগ ট্রাঙ্কুলাইজার গান দিয়ে অচেতন করে তাকে উদ্ধার করে। কয়েকদিন ধরে লোহার ফাঁদে আটকে থাকায় বাঘিনীর সামনের বাম পায়ে পচন ধরেছিল এবং তার জীবন ছিল চরম সংকটাপন্ন।

উদ্ধারের পর বাঘিনীটিকে খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।

মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি অফিসার ডা. জুলকার নাইন জানান, ‘শিকারিদের ফাঁদে বাঘিনীটির বাম পায়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। ৪ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত একটানা তিন মাস তাকে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত ড্রেসিং করা হয়েছে। এপ্রিল থেকে সে সুস্থ হতে শুরু করে। ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী এই বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ এবং স্বাভাবিকভাবে শিকার ধরার মতো হিংস্রতা ও শক্তি ফিরে পেয়েছে।’

প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী জানান, গত মে মাসে বাঘ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সভায় বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, বনের ভেতর অবমুক্তির পর বাঘিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করতে তার গলায় ‘স্যাটেলাইট কলার’ পরানোর প্রস্তাব উঠেছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট কলার ছাড়াই তাকে বনে অবমুক্ত করা হচ্ছে।

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বন বিভাগ অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাঘিনীটিকে সুস্থ করে অসাধারণ কাজ করেছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সে বনের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবে। বয়সের কারণে শিকার ধরতে হয়তো একটু বেগ পেতে হতে পারে, তবুও প্রকৃতির নিয়মেই— বাঘের মৃত্যু বাঘের মতোই (বনের বুকে) হওয়া উচিত।’

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বন্যপ্রাণী শিকার রোধে সুন্দরবনে এখন স্থলপথে পায়ে হেঁটে তল্লাশির পাশাপাশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বনে নজরদারির জন্য ৮টি ড্রোন ও ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

ডিএফও আরও জানান, বন বিভাগের কঠোর তৎপরতার কারণে গত এক বছরে সুন্দরবন থেকে রেকর্ড ১ লাখ ১৬ হাজার ফুট হরিণ ও বাঘ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এর ফলে সুন্দরবনে শিকারি চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে এসেছে।

খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার পাল জানান, পুনর্বাসন কেন্দ্রে বাঘিনীটিকে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ কেজি করে মাংস দেওয়া হতো। বনের প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরলে সে আরও ভালো থাকবে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনের মোট ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মধ্যে স্থলভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১৪৩ বর্গ কিলোমিটার, যার অর্ধেকেরও বেশি এখন সংরক্ষিত বনাঞ্চল। প্রতিটি বাঘ সাধারণত বনের ১৪ থেকে ১৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিজের ‘হোমরেঞ্জ’ বা সাম্রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করে বাস করে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের ‘ক্যামেরা ট্রাপিং’ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫টিতে, যা ২০১৫ সালে ছিল মাত্র ১০৬টি। তবে চোরাশিকারিদের ফাঁদ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরবনের এই জাতীয় পশুকে টিকিয়ে রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন