আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির/ ছবি পুরোনো
আসন্ন রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ও দাম যৌক্তিক রাখতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আমদানি ব্যয় কমাতে ফল ও খেজুরের শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে আলোচনা এবং পণ্য খালাস ও পরিবহনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স রুমে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে এ সভা হয়। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
রমজানের প্রস্তুতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে। এসব পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার কার্যক্রমও স্বাভাবিক আছে। রমজানসহ সারা বছর সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ। এই শুল্ক কমিয়ে ফল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার কাজ চলছে। খেজুরের শুল্ক কমানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলে তিনি জানান।
ফলের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শুল্ক পরিশোধের পরও মাল্টা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের অভিযানের পর দাম অনেকটা কমেছে বলে জানান তিনি।
রমজান বা অন্য কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। বাজার স্থিতিশীল রাখতে সারা বছর নজরদারি চলবে বলেও তিনি জানান।
সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো এবং পরিবহনব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা দূর করার কাজ চলছে। আমদানি, পণ্য খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ করে সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো হবে।
ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করতে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থা পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক করার কাজ চলছে বলেও জানান মন্ত্রী। এতে যেকোনো স্থান থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে সনদ ডাউনলোড করা যাবে।
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের আদলে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি) আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। ঘরে বসে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ ও আঙুলের ছাপের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে শেয়ার হস্তান্তরের ব্যবস্থা চালুর কাজও চলছে বলে জানান তিনি।
আমদানিকৃত শিল্প উপকরণের মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সোডিয়াম সালফেট বা সিনথেটিক লবণ এবং বিটুমিন আমদানিতে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) বাধ্যতামূলক করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ন্যূনতম মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়া ঠেকাতে অন্যান্য আমদানি পণ্যের শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ ১১ বছর তাদের বেতন বাড়েনি। মূল্যস্ফীতির কারণে তৈরি হওয়া ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থা এখনো কার্যকর হয়নি। এক বছরে ধাপে ধাপে এ সমন্বয় করার কথা রয়েছে। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এর বাস্তব প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই।
সভায় ব্যবসায়ী নেতারাও রমজানে পর্যাপ্ত ভোগ্যপণ্য সরবরাহের আশ্বাস দেন। সভার সভাপতি সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত। ডাল, ছোলা, গম, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রধান ভোগ্যপণ্যের কোনো কৃত্রিম সংকট হতে দেওয়া হবে না।
বাজারের চাহিদা ও মজুদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্য খালাস নির্বিঘ্ন রাখার কথা জানান তিনি।
মোহাম্মদ আমিরুল হক চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র উল্লেখ করেন। এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের জন্য ন্যায্য সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা ও ভোক্তাস্বার্থ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ূন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে এমন অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া দরকার। সরাসরি জাতীয় আমদানি নীতি ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করার অনুরোধ জানান তিনি।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, গত রমজানের মতো এবারও চাল, ডাল, ছোলা, গম, সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিছু রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও চালু প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদা পূরণে কাজ করছে।
বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পণ্যের ঘাটতি দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। রমজানে সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি এড়িয়ে কাস্টমস, বন্দর ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে চেম্বারের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলী আহমদ, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এম এ সালাম, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার আবুল বাসার মো. শফিকুর রহমান এবং সাবেক পরিচালক এস এম আবু তাইয়বসহ ব্যবসায়ী নেতারা বক্তব্য দেন।
