বিদেশি বিনিয়োগে খুলছে বেক্সিমকোর বন্ধ কারখানা, প্রথম ধাপে কর্মসংস্থান ২,৫০০
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংক ঋণের বড় বোঝা ও দীর্ঘদিনের বন্ধ কার্যক্রমের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের গাজীপুরের শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে একটি কারখানা নতুন ব্যবসায়িক মডেলে চালু করতে ব্রিটিশ ও চীনা দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট ২৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী বছরের এপ্রিলেই উৎপাদন শুরু হতে পারে।
গাজীপুরের কাশিমপুরে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে বন্ধ থাকা ১৬টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল ইউনিটের মধ্যে প্রথমে ‘প্রিফিক্স ফ্যাশনস লিমিটেড’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগে অর্থায়ন করবে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘চার্টার এইচসিপি লিমিটেড’ ও চীনা প্রতিষ্ঠান ‘বেস্টিং লিমিটেড’। পুরো উদ্যোগে অ্যাসেট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে জাপানি-বাংলাদেশি যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘রিভাইভাল গ্লোবাল’।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকো গ্রুপের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য লিজ বা চুক্তিতে যাবে। উৎপাদন ও রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থ সরাসরি নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। এরপর ঋণের বিপরীতে লিয়েনধারী ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই অর্থ থেকে কিস্তি কেটে নেবে। ফলে ঋণ পরিশোধের অর্থ ব্যবস্থাপনায় বেক্সিমকো গ্রুপের সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকবে না।
উদ্যোক্তাদের ধারণা, এ ব্যবস্থায় কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম চালু রাখার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে আগামী ১১ অক্টোবর ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে বেক্সিমকো ও রিভাইভাল গ্লোবালের কর্মকর্তাদের। এরপর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রিফিক্স ফ্যাশনস চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
কারখানাটি চালু হলে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। উৎপাদিত পোশাকের বড় অংশই রপ্তানি করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ হবে জ্যাকেট। উৎপাদন শুরুর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এ কারখানা থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
প্রিফিক্স ফ্যাশনসের মাধ্যমে নেওয়া উদ্যোগ সফল হলে একই মডেলে পর্যায়ক্রমে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বাকি ১৫টি বন্ধ ইউনিটও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর চাকরি হারানো ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিকের পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বন্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের কারখানাগুলো ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মুখে পড়ে। পরে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করে। এর আগে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে সরকার ৫২৬ কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছিল।
বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকানার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান যুক্ত। বর্তমানে তিনি কারাবন্দী রয়েছেন।
ঋণের চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে গাজীপুরের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ৩২টি কারখানার বিপরীতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। এর সবচেয়ে বড় অংশের পাওনাদার রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির পাওনা প্রায় ২৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
এ পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রথমে একটি কারখানা চালু করে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে চাইছে বেক্সিমকো। প্রিফিক্স ফ্যাশনসের উদ্যোগ সফল হলে একই মডেলে শিল্পপার্কের অন্যান্য বন্ধ ইউনিট চালুর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে একটি কারখানা দিয়ে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বেক্সিমকোর বন্ধ শিল্পপার্ককে ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত করার পথ তৈরি করতে পারে।