সস্তা আমদানির ধাক্কায় টালমাটাল দেশীয় কাগজশিল্প
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
বহুমুখী সংকটে দেশের কাগজশিল্প। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কম দামে প্রস্তুত (ফিনিশড) কাগজ আমদানি দেশীয় শিল্পকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশীয় কাগজকলগুলোও অসম প্রতিযোগিতার মুখে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে দেশে কাগজশিল্পে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। এ খাতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় প্রায় ১০০টি কাগজকল রয়েছে।
এসব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদা পূরণের পরও প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং কম দামে আমদানীকৃত কাগজের কারণে বেশির ভাগ মিল পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সচিব এ কে এম নওশেরুল আলম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। দেশীয় শিল্প রক্ষা, কর্মসংস্থান বজায় রাখা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে বিপিএমএর আমদানিকৃত প্রস্তুত কাগজের ন্যূনতম কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৯৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে সংগঠনটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ২৯.৫ ইঞ্চি রোল, ২০ অথবা ৩০ শিট এবং ৭০ বা ৮০ জিএসএম অফ-হোয়াইট ন্যাচারাল শেড প্রিন্টিং পেপার আমদানি নিষিদ্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে।
৮০টি মিল বন্ধ, আরও ২৬টি ঝুঁকিতে
বিপিএমএর দাবি, সস্তা আমদানির কারণে এরই মধ্যে দেশের ৮০টি কাগজ মিল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরো ২৬টি মিল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পাশাপাশি সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগও নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) মোহাম্মদ ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ বলেন, ‘এনসিটিবির কাগজের চাহিদা ও সরবরাহ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাসচিবের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। ওই বৈঠকে আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহযোগিতা পেলে দেশীয় রাইটিং ও প্রিন্টিং পেপার মিলগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এনসিটিবির প্রয়োজনীয় কাগজ সরবরাহ করতে সক্ষম।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টি রাইটিং ও প্রিন্টিং পেপার মিল উৎপাদনে রয়েছে। এসব মিলের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা দেশের চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, কার্যকর মূলধন এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় শিল্প পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারবে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাগজ রপ্তানি সম্ভব হবে।’
মোহাম্মদ ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ বলেন, ‘এনসিটিবিতে কাগজ সরবরাহের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অনেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাল্প আমদানি করেছে এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে। এখন যদি বিদেশ থেকে প্রস্তুত কাগজ আমদানি করা হয়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন পরিকল্পনা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিদেশ থেকে কাগজ আমদানির পক্ষে সক্রিয় রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় আমদানির ফলে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হবে, হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে, দেশীয় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশীয় শিল্পকে রক্ষা করা, কর্মসংস্থান বজায় রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়তে সরকারের উচিত দেশীয় কাগজশিল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ থেকে কাগজ আমদানি নিরুৎসাহিত করা।’
পাল্পের শুল্কায়ন ভিত্তিমূল্য ৮৪০ ডলার, বিপরীতে কাগজের শুল্কায়ন ভিত্তিমূল্য ৬০০ ডলার কিভাবে?
এ বিষয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে দেশের কাগজ উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল পাল্প সম্পূর্ণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আগে বাঁশ ও কাঠ থেকে দেশে পাল্প উৎপাদন হলেও কাঁচামালের সংকটের কারণে এখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হতে হয়েছে। পাল্প আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি টনের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ৮৪০ মার্কিন ডলার হলেও প্রস্তুত কাগজ আমদানির সময় অনেক ব্যবসায়ী আন্ডার-ইনভয়েসিং করে মাত্র ৬০০ ডলার মূল্য দেখিয়ে শুল্কায়ন করছেন। এতে দেশীয় শিল্প মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং একের পর এক পেপার মিল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমন্বয় করা হচ্ছে।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘যেহেতু পাল্পের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ৮৪০ ডলার, তাই প্রস্তুত কাগজের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় যোগ করে অন্তত আরো ২০০ ডলার বাড়িয়ে প্রায় এক হাজার ডলারের কাছাকাছি অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণ করা উচিত। আমরা কাগজ আমদানি বন্ধ করার দাবি করছি না। আমরা শুধু চাই একটি সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, কাগজশিল্প শুধু একটি উৎপাদনশিল্প নয়—এটি শিক্ষা, প্রকাশনা, ওষুধ, খাদ্য, প্যাকেজিং এবং তৈরি পোশাকসহ বহু শিল্পের অন্যতম ভিত্তি। ফলে শিল্পটি দুর্বল হয়ে পড়লে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। তাই আন্ডার-ইনভয়েসিং বন্ধ, ন্যায্য শুল্কায়ন, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা গেলে দেশীয় কাগজশিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণই নয়, ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।