আর্থিক খাতে ফিরছে শৃঙ্খলা, দরকার বিনিয়োগ বান্ধব নীতিমালা- দ্বিতীয় পর্ব
উচ্চ সুদের চাপে স্থবির বিনিয়োগ
ডেইলি সান রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ক্রমেই শ্লথ হয়ে পড়ছে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে আটকে আছে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি।
ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদের চাপ ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন- যা শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের চাহিদাও কমেছে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে নতুন বিনিয়োগ না হলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়ে না। বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ খুবই সীমিত।
ব্যাংকাররাও একই মত প্রকাশ করে জানান, উচ্চ সুদহার, দুর্বল চাহিদা এবং নীতিগত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বিনিয়োগ স্থবিরতার একটি বড়ো সূচক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড়ো শিল্পগ্রুপগুলোর অনেক কারখানা বন্ধ বা আংশিক সক্ষমতায় চলায় ব্যাংক ঋণের চাহিদা আরও কমেছে। কিছু শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাবসা ও বিনিয়োগে।
উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কমছে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ। পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকও।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে আমানত গ্রহণ করলেও ঋণ বিতরণ করেছে গড়ে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ সুদে। এতে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তবে বাস্তবে কিছু ব্যাংকে এই ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড়ো চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। এতে ঋণের খরচ বেড়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যেখানে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ৩ শতাংশের নিচে, সেখানে বাংলাদেশের এই উচ্চ স্প্রেড প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউরোপের দেশগুলোতে এই স্প্রেড ১ শতাংশের বেশি নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ দুই শতাংশ পর্যন্ত। ভারতে এই স্প্রেড ৩ শতাংশের মধ্যে।
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। সভায় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্প্রেড বেড়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সম্মিলিত উদ্যোগে তা সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার তাগিদ দেন। যদিও এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনও নির্দেশনা না দিয়ে নৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার পথেই হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত সরে গিয়ে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে থাকা ব্যাংকে জমা হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংক কম সুদ দিয়েও প্রচুর আমানত পাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ সেই অনুপাতে কমানো হচ্ছে না। অপরদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। এসব কারণে স্প্রেড আরও বেড়েছে। উচ্চ স্প্রেড ব্যাংকের মুনাফা বাড়ালেও অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, ঋণের খরচ বেশি হলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যাবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ সীমা কার্যকর ছিল।
আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয় এবং একই বছরের নভেম্বরে স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না এলে ঋণের উচ্চ খরচ তাদের জন্য বড়ো বাধা হয়ে থাকবে। তাই বিনিয়োগ ও উৎপাদন সচল রাখতে স্প্রেড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে গভীর সংকট বিনিয়োগে স্থবিরতা। বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগ দুটোই নেমে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিনিয়োগের এ স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের গতি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর।
এ প্রেক্ষাপটে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে না আনতে পারলে সংকট আরও গভীর হবে। গত রবিবার সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘বিনিয়োগ কমে যাওয়াই এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড়ো সমস্যা। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান কমে, বেকারত্ব বাড়ে এবং অর্থনীতিতে অস্বস্তি তৈরি হয়।’
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাংক সুদহার জরুরি। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো পাল্লা দিয়ে বাড়াচ্ছে আমানত ও ঋণের সুদ হার। বর্তমানে বাংলাদেশে সুদের হার ১৪ শতাংশের ওপরে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ১০ থেকে ১১ শতাংশ মুনাফা করে।
এ অবস্থায় এই উচ্চ সুদ কোনোভাবেই ব্যাবসাবান্ধব নয়। উচ্চ হারে ঋণ নিয়ে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হলো: উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে সরবরাহজনিত কাঠামোগত সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে, যখন মূল্যস্ফীতি সরবরাহজনিত কারণে ঘটে, তখন শুধু সুদের হার বাড়ানোর নীতি বিনিয়োগকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং ঋণের বর্ধিত খরচের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।