EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

ধ্বংসের পথে শত বছরের সদাসদি জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণে নেই কার্যকর উদ্যোগ

মো. শাহজাদা শাহাদাত, নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৯ এএম

ধ্বংসের পথে শত বছরের সদাসদি জমিদার বাড়ি, সংরক্ষণে নেই কার্যকর উদ্যোগ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সদাসদি জমিদার বাড়ি। ছবি: ডেইলি সান

অ অ

একসময় জমিদারি ঐতিহ্য, নান্দনিক স্থাপত্য আর কারুকার্যে দূর-দূরান্তের মানুষের নজর কাড়ত নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সদাসদি জমিদার বাড়ি। বিশাল দোতলা ভবনের ১০১টি কক্ষ, নকশা করা দরজা-জানালা আর শানবাঁধানো পুকুর-ঘাট সাক্ষ্য দিত সেই জৌলুশের। কালের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন এখন ধুঁকছে শেষ অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখতে। অযত্ন-অবহেলা, দখল ও মূল্যবান স্থাপত্য উপকরণ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগে শত বছরের পুরোনো জমিদার বাড়িটি আজ পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ইতিহাসের এই সাক্ষীটুকুও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার গোপালদী পৌরসভার সদাসদি এলাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ওপর এই জমিদার বাড়ি নির্মাণ করা হয়। স্থানীয় প্রবীণদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩২৩ বঙ্গাব্দে তৎকালীন জমিদার তিন ভাই প্রসন্ন কুমার সর্দার, মরিন্দ্র কুমার সর্দার ও শ্রী গোপাল চন্দ্র সর্দার বাড়িটি নির্মাণ করেন। তাঁদের ভাষ্য, জমিদার গোপাল চন্দ্রের নাম অনুসারেই পরবর্তী সময়ে এলাকার নাম গোপালদী রাখা হয়।

একসময় সদাসদি জমিদার বাড়ির পরিচিতি ছিল বিস্তৃত এলাকাজুড়ে। জমিদারি ঐতিহ্য, নান্দনিক স্থাপত্য, কারুকাজ ও বিশাল আকৃতির ভবন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছেও স্থাপনাটি ছিল আকর্ষণীয়। বাড়ির নকশা করা দরজা-জানালা, লোহার কারুকাজ, বিশাল পুকুর ও শানবাঁধানো ঘাট ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তবে সেই জৌলুশ এখন অতীত। দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে। চারপাশে গজিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড় ও আগাছা। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না থাকায় পুরো এলাকাটি এখন অনেকটা পরিত্যক্ত স্থাপনার চেহারা নিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমিদার বাড়িটির যথাযথ সরকারি তদারকি নেই। এ সুযোগে বাড়িটির বিভিন্ন অংশে দখলদারিত্ব তৈরি হয়েছে। ভবনের দরজা-জানালা, লোহার গ্রিলসহ মূল্যবান স্থাপত্য উপকরণও একে একে উধাও হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।

কবির হোসেন জানান, সদাসদি জমিদার বাড়িটি একসময় বিশাল আকারের একটি দোতলা স্থাপনা ছিল। বাড়িটিতে প্রায় ১০১টি কক্ষ ছিল। নান্দনিক কারুকাজ, নকশা করা দরজা-জানালা ও স্থাপত্যশৈলী দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে ভবনের অধিকাংশ অংশই জরাজীর্ণ। কোথাও দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও ছাদের অংশ ভেঙে পড়েছে। চারপাশে ঝোপঝাড় ও আগাছা জন্মেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় বাড়িটি এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত।

আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, একসময় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই বাড়ি দেখতে আসতেন। এখন বাড়িটির অবস্থা দেখে মনে হয়, দেখভাল করার কেউ নেই। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অল্প সময়ের মধ্যেই ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বাড়িটির বিভিন্ন অংশ দখল করে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটি রক্ষায় প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও দাবি করেন তিনি।

জমিদার বাড়ির পাশের বিশাল শানবাঁধানো পুকুরটিও এখনো অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। জয়নাল আবেদীন জানান, একসময় পুকুরটির চারপাশে চারটি ঘাট ছিল। জমিদার বাড়ির পাশাপাশি এসব পুকুর ও ঘাটও এলাকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘাটগুলো ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। পুকুর ও আশপাশের পরিবেশও হারিয়েছে আগের রূপ। জয়নাল আবেদীনের মতে, পুকুর ও ঘাটগুলো সংস্কার করে সংরক্ষণ করা গেলে জমিদার বাড়িকে ঘিরে পুরো এলাকাটিকে একটি ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

সদাসদি জমিদার বাড়ি নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো মালিকানা বিরোধ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাড়িটির মালিকানা দাবি করে একাধিক ব্যক্তি স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ দখলে নিয়েছেন।

মালেক মিয়া বলেন, বাড়িটির মালিকানা ও জমির প্রকৃত স্বত্ব নিয়ে বিরোধ থাকায় প্রশাসনিকভাবে কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জমির খতিয়ান, দলিল, নামজারি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।

এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, হারিজুল ইসলাম হারি মেম্বার, মেহেদী হাসান ও রফিক নামে তিন প্রভাবশালী ব্যক্তি জমিদার বাড়িটির মালিকানা দাবি করেন। জমিদার বাড়িটির জমি বন্ধক রেখে হারিজুল ইসলাম হারি মেম্বার ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জমির মালিকানা, দলিলের বৈধতা, নামজারি এবং ব্যাংকের কাছে জমি বন্ধক রাখার বিষয়গুলো সরকারি রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

জমিদার বাড়িটির একাংশের মালিক বলে দাবি করা হারিজুল ইসলাম হারি মেম্বার মালিকানার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জমিদার বাড়িটি ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের রদবদলের মাধ্যমে এ দেশে আসে। পরে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তাঁরা ওই জমি কিনেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

হারিজুল ইসলাম হারি মেম্বারের ভাষ্য, ওই জমির দলিল বন্ধক রেখে তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল, সরকারি ভূমি রেকর্ড ও ব্যাংকের নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

বাড়িটির দরজা-জানালা, লোহার গ্রিল ও বিভিন্ন স্থাপত্য উপকরণ চুরি বা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে এসব উপকরণের একটি অংশ ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে।

মালেকের দাবি, জমিদার আমলের স্থাপত্যশৈলীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক নিদর্শন ভবনটির বিভিন্ন অংশে ছিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এসব উপকরণ এখন আর আগের অবস্থায় নেই। দরজা-জানালা, লোহার গ্রিলসহ বিভিন্ন জিনিস সরিয়ে নেওয়া হলে ভবিষ্যতে ভবনটি সংস্কার করলেও এর মূল স্থাপত্য ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে শুধু ভবনের মূল কাঠামো রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। দরজা, জানালা, লোহার কারুকাজ, অলংকরণ ও অন্যান্য নির্মাণ উপাদানও স্থাপনাটির ইতিহাস ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব উপকরণ হারিয়ে গেলে ভবিষ্যতে স্থাপনাটির মূল বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

এলাকার আরেক বাসিন্দা বুলবুল বলেন, এত পুরোনো ও ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা ধ্বংসের মুখে থাকলেও এটি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা দ্রুত পরিদর্শন করে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণ করা দরকার। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে ভবনটি সংরক্ষণ করা উচিত।

এলাকাবাসীর দাবি, জমিদার বাড়িটির ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী, পুকুর ও ঘাট সংরক্ষণ করা গেলে এটি শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য রক্ষা করবে না, পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। সংস্কার ও সংরক্ষণের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।

জমিদার বাড়িটির বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, শিগগিরই বাড়িটি সরকারি অধীনে নিয়ে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

প্রশাসনের এই উদ্যোগ কবে বাস্তবায়ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ দীর্ঘদিনের অযত্ন, দখল, চুরি ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে ভবনটির অবস্থা ইতোমধ্যে নাজুক হয়ে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শত বছরের পুরোনো এই স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হারিয়ে যেতে পারে।

এলাকাবাসীর মতে, সদাসদি জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি আড়াইহাজারের ইতিহাস, স্থাপত্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মালিকানা বিরোধ ও দখলের বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করে স্থাপনাটির মূল কাঠামো, স্থাপত্য উপকরণ, পুকুর ও ঘাট সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনার শেষ চিহ্নটুকুও।

আরও পড়ুন