অবকাঠামো নাকি প্রযুক্তি
বাংলাদেশের পর্যটন রূপান্তরে চীন যেভাবে ভূমিকা রাখতে পারে
দেড় হাজারের কাছাকাছি পর্যটনকেন্দ্রের দেশ বাংলাদেশ কেন চীনা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখনো অচেনা?
কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকত থেকে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার—বাংলাদেশের এই বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে চেনানোর সময় এখনই।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্রমণপিপাসু জাতির নাম চীন। প্রতিবছর কোটি কোটি চীনা নাগরিক দেশের বাইরে ঘুরতে যান। অথচ সেই তালিকায় বাংলাদেশের নাম প্রায় নেই। অথচ ভূগোলের হিসাবে দুই দেশ কাছাকাছি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর, বন্ধুত্বও পুরোনো।
বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মাসে গড়ে কয়েক হাজার চীনা নাগরিক বাংলাদেশে আসেন। তাঁদের বেশির ভাগই আসেন চাকরি বা ব্যবসার কাজে। ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনা পর্যটকের ভিড় বাড়ছে।
অথচ বাংলাদেশের ঝুলিতে আছে কী না! সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের চা-বাগান আর ঝরনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা জনগোষ্ঠীর রঙিন জীবন, আর বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। দেশের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে এখন একটি বড় পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনায় চীন কীভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে?
দূরত্বটা মানচিত্রে নয়, পরিচয়ে
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ‘চীন আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র। কিন্তু প্রচারের অভাব, ভাষার সীমাবদ্ধতা ও নানা জটিলতার কারণে আমরা চীনা পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত অংশকে এখনো টানতে পারিনি।’ তাঁর ভাষ্য, চূড়ান্ত হতে থাকা পরিকল্পনায় সরাসরি ফ্লাইট বাড়ানো, চীনা ভাষা জানা গাইডের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চীনের মূল ভূখণ্ডে অনলাইন প্রচার জোরদার করার কথা রাখা হয়েছে।
মাঠের বাস্তবতা: গাইড, খাবার ও আতিথেয়তা
নীতিনির্ধারকদের আগ্রহই যথেষ্ট নয়, মাঠের প্রস্তুতিও চাই। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ বলেন, চীনা পর্যটকেরা সাধারণত নিজেদের ভাষার গাইড ও নিজেদের রুচির খাবার পছন্দ করেন। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ ট্যুর অপারেটর এখনো এই চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত নয়।
তবে সমাধানের পথও তিনি দেখছেন। হানিফ বলেন, ‘চীন যদি আমাদের গাইডদের প্রশিক্ষণ এবং আতিথেয়তা খাতের দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি সহায়তা দেয়, তাহলে বেসরকারি খাত খুব দ্রুত চীনা পর্যটকদের জন্য স্বস্তির পরিবেশ গড়ে তুলতে পারবে।’
এখানেই আসে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কথা। পর্যটক শুধু দর্শনীয় জায়গা দেখে ফেরেন না, সঙ্গে নিয়ে যান একটি দেশের ভাষা, খাবার আর মানুষের আন্তরিকতার স্মৃতি। চীনা ভাষা জানা গাইড আর পরিচিত স্বাদের খাবার যেমন অতিথিকে স্বস্তি দেবে, তেমনি চীনা সমাজের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে নতুন করে তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হবে।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও একই কথা বলেন। তাঁর মতে, ‘দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ মজবুত করতে পর্যটন একটি চমৎকার মাধ্যম।’ তিনি জানান, ঢাকা থেকে বেইজিং ও গুয়াংজুসহ বড় শহরগুলোর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতায় বাংলাদেশের পর্যটন অবকাঠামো ও বিনোদনকেন্দ্রে বিনিয়োগ করতে চীনা বিনিয়োগকারীরা বেশ আগ্রহী।
ইউনানের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তির হাত
পর্যটনে চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের শেখার আছে অনেক কিছু। স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে পর্যটন সামলানোয় চীন বিশ্বের সামনের সারিতে। দেশটির ইউনান প্রদেশ প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন আর গ্রামীণ পর্যটনের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতির চেহারা বদলে ফেলেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফল ‘ইউনান মডেল’ সুন্দরবন, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামেও কাজে লাগতে পারে। এতে প্রকৃতি রক্ষা পাবে, স্থানীয় মানুষের আয়ের নতুন পথও খুলবে।
প্রযুক্তির দিকেও সুযোগ আছে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের ভাবনার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ভার্চুয়াল ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এখানে চীনা প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাংলাদেশের পর্যটনকে আধুনিক যুগে পৌঁছে দিতে পারে।
পাঁচ পদক্ষেপ
চীনা বাজারকে সফলভাবে ধরতে হলে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দরকার। সহজ ভিসা নীতি। অন-অ্যারাইভাল ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং দ্রুত ই-ভিসা চালু করা।
ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি। পর্যটন বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাষা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে প্রতি বছর অন্তত ৫০০ দক্ষ চীনা ভাষার গাইড তৈরি করা।
সরাসরি বিমান সংযোগ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে চীনের বড় বাণিজ্যিক ও পর্যটন শহরের ফ্লাইটের ফ্রিকোয়েন্সি দ্বিগুণ করা।
ডিজিটাল প্রচারণা। উইচ্যাট ও ডুইনের মতো জনপ্রিয় মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন স্পট নিয়ে চীনা ভাষায় আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি করা।
যৌথ পর্যটন মেলা। দুই দেশের ট্যুর অপারেটরদের মধ্যে নিয়মিত বিটুবি ম্যাচমেকিং সেশন ও পর্যটন মেলা আয়োজন করা, যাতে প্যাকেজ বিনিময় সহজ হয়।
কাছের বন্ধু, কাছের গন্তব্য
সরকারের নীতিগত সদিচ্ছা, ট্যুরিজম বোর্ডের আধুনিক মহাপরিকল্পনা এবং চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, এই তিনের মেলবন্ধন ঘটলে পর্যটনের বর্তমান স্থবিরতা কাটানো সম্ভব। পর্যটক আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মানুষের পরিচয় গভীর হবে, ভাষা, খাবার ও গল্পের আদান-প্রদান ঘটবে। লজিস্টিকস ও আস্থার দূরত্বটুকু ঘুচলে ‘কাছের বন্ধু’ চীনের জন্য বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে অন্যতম প্রধান ‘কাছের গন্তব্য’।
লেখক: সাব-এডিটর, ডেইলি সান অনলাইন