পর্তুগাল ছেড়েও থামছেন না রোনালদো, লক্ষ্য ১০০০ গোল
ঐতিহাসিক এই মাইলফলক থেকে তিনি আর মাত্র ১৫ গোল দূরে আছেন
খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও পাঁচবারের শিরোপাজয়ী রোনালদো।
অবশেষে পর্তুগালের জার্সি তুলে রাখার চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা নিশ্চিত করেছেন, দেশের হয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অধ্যায় এখানেই শেষ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাট চুকিয়ে দিলেও মাঠের লড়াই এখনই থামছে না সিআরসেভেনের (CR7)। বর্তমান ক্লাব আল-নাসরের হয়ে ফুটবল খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের পর এখন রোনালদোকে বুট জোড়া সচল রাখতে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করছে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড—ক্যারিয়ারে ১,০০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা। বর্তমানে পেশাদার ফুটবলে তাঁর গোলসংখ্যা ৯৮৫। ঐতিহাসিক এই মাইলফলক থেকে তিনি আর মাত্র ১৫ গোল দূরে আছেন।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই জাদুকরের বিদায়লগ্নে স্পোর্টিং লিসবন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের হয়ে তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারের কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তুলে ধরেছে ‘বিবিসি স্পোর্ট’:
যে বন্ধুত্ব বদলে দিয়েছিল ইতিহাস (২০০৩)
স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে মূল দলে মাত্র ৩১টি ম্যাচ খেলে ৫টি গোল করেছিলেন তরুণ রোনালদো। ২০০৩ সালের এক প্রাক-মৌসুম প্রীতি ম্যাচে লিসবনের হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়ে দুটি গোলে সহায়তা করে তিনি রেড ডেভিলসদের নজর কাড়েন।
রোনালদো জানান, ম্যাচ শেষে ইউনাইটেড বস স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তাঁকে খেলোয়াড়দের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে সরাসরি ড্রেসিংরুমে নিয়ে যান। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) পাউন্ডের বিনিময়ে তিনি ওল্ড ট্রাফোর্ডে যোগ দেন।
ফার্গুসন সেই স্মৃতি হাতড়ে বলেছিলেন, ‘ম্যাচ শেষে বিমানে ফেরার পথে ক্লাবের সিনিয়র ফুটবলাররা অনবরত ওকে দলে নেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করছিল। আমার দেখা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ খেলোয়াড় ছিল সে।’
প্রথম প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা (২০০৭)
ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম মৌসুমেই এফএ কাপের ফাইনালে গোল করে শিরোপা জেতেন রোনালদো। তবে ২০০৬-০৭ মৌসুমে তাঁর ক্যারিয়ারে যেন বিস্ফোরণ ঘটে। সেবার প্রিমিয়ার লিগে ১৭টি গোল করে প্রথমবারের মতো দুই অঙ্কের কোটা স্পর্শ করেন তিনি। একই মৌসুমে লিগ শিরোপার পাশাপাশি বর্ষসেরা খেলোয়াড় ও বর্ষসেরা তরুণ খেলোয়াড়ের খেতাব লুফে নেন তিনি। পরের মৌসুমে ফাইনালে গোল করে প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ইউরোপীয় গোল্ডেন শু লাভ করেন।
৪০ গজ দূর থেকে পুসকাস জয় (২০০৯)
ইউনাইটেডের প্রথম মেয়াদে ২৯২ ম্যাচে ১১৮টি গোল করেছিলেন রোনালদো। তবে ২০০৯ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এফসি পোর্তোর বিপক্ষে নিজের মাটিতে প্রায় ৪০ গজ দূর থেকে নেওয়া তাঁর এক বুলেট গতির শট টপ কর্নার দিয়ে জালে জড়ায়। এই অবিশ্বাস্য গোলটি ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ‘ফিফা পুসকাস পুরস্কার’ (বর্ষসেরা গোল) জিতে নেয়। এর কয়েক মাস পরেই ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি) পাউন্ডের রেকর্ড ট্রান্সফারে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন তিনি।
এল ক্লাসিকোর সেই ‘ট্রেডমার্ক’ হেডার (২০১১)
রিয়াল মাদ্রিদে রোনালদোর প্রথম মৌসুম ট্রফিশূন্য কাটলেও দ্বিতীয় মৌসুমে কোপা দেল রে-র ট্রফি জেতেন। বার্সেলোনার বিপক্ষে ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে আনহেল দি মারিয়ার ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে নিখুঁত এক ট্রেডমার্ক হেডারে গোল করে রিয়ালকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন তিনি। এটিই ছিল কোনো টুর্নামেন্টের ফাইনালে রোনালদোর প্রথম জয়সূচক গোল।
রিয়ালের সর্বকালের সেরা গোলদাতা (২০১৫)
২০১৫ সালের অক্টোবরে লেভান্তের বিপক্ষে গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান ৩০ বছর বয়সী রোনালদো। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর হয়ে মাত্র ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০টি গোল করেন তিনি। এর মধ্যে টানা ছয়টি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫০ বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েন এই স্ট্রাইকার।
অধরা ইউরো জয় (২০১৬)
রোনালদোর সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারে একমাত্র আন্তর্জাতিক শিরোপার যে অভাব ছিল, তা পূরণ হয় ২০১৬ সালে। প্যারিসের ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে পর্তুগাল। ম্যাচের প্রথমার্ধে চোট পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেও সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে দলের অনানুষ্ঠানিক কোচের ভূমিকা পালন করেছিলেন রোনালদো। টুর্নামেন্টে ৩টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করে সেরা একাদশে জায়গা করে নেন তিনি। ইউরোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৪ গোল নিয়ে এই টুর্নামেন্টকে বিদায় জানালেন সিআরসেভেন। তবে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটি তাঁর অধরাই থেকে গেল।
পঞ্চম ব্যালন ডি’অর ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সেঞ্চুরি (২০১৭)
২০১৬-১৭ মৌসুমে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগা জেতার পর নিজের পঞ্চম ব্যালন ডি’অর জিতে লিওনেল মেসির রেকর্ডে ভাগ বসান রোনালদো। একই বছর বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ইউরোপের শীর্ষ এই প্রতিযোগিতায় ১৮৭ ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৪১টি গোলের রেকর্ড এখনো তাঁর দখলে।
অবিশ্বাস্য ‘বাইসাইকেল কিক’ (২০১৮)
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে বাতাসে শরীর ভাসিয়ে এক অবিশ্বাস্য অ্যাক্রোবেটিক বাইসাইকেল কিকে বল জালে জড়ান রোনালদো। গোলটি এতটাই চোখধাঁধানো ছিল যে, প্রতিপক্ষ জুভেন্টাসের সমর্থকেরাও দাঁড়িয়ে রোনালদোকে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানান। কাকতালীয়ভাবে, এর কয়েক মাস পরেই তিনি জুভেন্টাসে যোগ দিয়েছিলেন।
প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৫টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৮)
ইউরোপের সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতায় নিজেকে ‘কিংবদন্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন রোনালদো। ২০০৮ সালে ইউনাইটেডের হয়ে প্রথম এবং পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আরও ৪ বার (২০১৪, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮) চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতেন। প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৫টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। (অবশ্য তাঁর বিদায়ের পর রিয়ালের টনি ক্রুস, কারভাহাল, মদ্রিচ ও নাচো ৬টি শিরোপা জিতে এই রেকর্ড ছাড়িয়ে যান)।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিশ্ব রেকর্ড (২০২১)
ইরানের আলি দাইয়ের করা আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০৯ গোলের রেকর্ডটি একসময় মনে হতো অভেদ্য। তবে ২০২১ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জোড়া হেডারে ১১১তম গোল করে সেই রেকর্ড নিজের করে নেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করার আগে দেশের হয়ে রেকর্ড ২৩৪ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৬-এ।
লক্ষ্য এবার ১০০০ গোল!
পর্তুগাল ও ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের গৌরবময় অধ্যায় পেরিয়ে রোনালদো এখন মাঠ মাতাচ্ছেন সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে। ২০২৪ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে প্রথম ফুটবলার হিসেবে পেশাদার ক্যারিয়ারে ৯০০ গোলের মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন তিনি।
এখন পর্যন্ত স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে ৫টি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ১৪৫টি, রিয়াল মাদ্রিদে ৪৫০টি, জুভেন্টাসে ১০১টি, আল-নাসরের হয়ে ১৩৮টি এবং পর্তুগালের হয়ে ১৪৬টি গোল করেছেন তিনি।
সম্প্রতি রোনালদো নিজেই নিশ্চিত করেছেন, ১,০০০ গোলের চূড়ায় পৌঁছানোই এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তবে তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিও ৯৩১ গোল নিয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ফলে ১,০০০ গোলের জাদুকরী ক্লাবে প্রথম সদস্য হিসেবে নাম লেখাতে রোনালদোকে আল-নাসরের জার্সিতে দ্রুতই বাকি ১৫টি গোল তুলে নিতে হবে।