EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

‘নেইমার-নির্ভরতা’ থেকে মুক্তি যে সুযোগ এনে দিতে পারে

নেইমারের বিদায়ে যে ব্রাজিল দলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটিই হতে পারে সেলেসাওদের নতুন করে গড়ে ওঠার আসল সুযোগ

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

‘নেইমার-নির্ভরতা’ থেকে মুক্তি যে সুযোগ এনে দিতে পারে

ম্যাচ শেষে হতাশ দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র, নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ছবি: রয়টার্স 

অ অ

নেইমারের বিদায়ে বাংলাদেশের কোটি কোটি ব্রাজিল-ভক্তের মনে যতটা আক্ষেপ কাজ করছে, ফুটবল বিশ্লেষকদের চোখে বিষয়টি ঠিক ততটাই ভিন্ন। তাঁদের মতে, ব্রাজিলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল অতিরিক্ত ‘নেইমার-নির্ভরতা’—আর সেই নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার এখনই সবচেয়ে বড় সুযোগ।

বিগত বছরগুলোতে সেলেসাওদের মূল সমস্যা ছিল একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। নেইমার মাঠে থাকা মানেই বাকিরা তাঁর দিকে বল বাড়িয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরে ফেলতেন— আক্রমণের পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা, এমনকি চাপ সামলানোর দায়িত্বও ঘুরেফিরে এসে পড়ত তাঁর কাঁধেই। প্রতিপক্ষ দলগুলোও এই প্যাটার্ন বুঝে নিয়ে খেলার কৌশল সাজাত নেইমারকে ঘিরেই— তাঁকে আটকাতে পারলেই যেন ব্রাজিলের আক্রমণ অনেকটা নিষ্প্রভ হয়ে পড়ত। ২০২৬ বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ১৬-এ নরওয়ের বিপক্ষে ২-১ গোলের হারেও এই একমুখী নির্ভরতার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

বর্তমান বিশ্ব ফুটবল একক নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত রসায়নের ওপর অনেক বেশি জোর দেয়। স্পেন থেকে শুরু করে ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনা— সাম্প্রতিক সময়ে যে দলগুলো সাফল্য পেয়েছে, তাদের প্রতিটিতেই দেখা গেছে বহুমুখী আক্রমণ ও ভাগাভাগি করা দায়িত্ব। নেইমার না থাকায় ব্রাজিলের সামনে এখন সেই একই পথে হাঁটার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। দলের ১১ জন খেলোয়াড়ই এখন সমান দায়িত্ব নিয়ে খেলতে বাধ্য হবেন, যা দলকে করে তুলতে পারে আরও অপ্রত্যাশিত ও পড়া কঠিন।

এই রূপান্তরের মূল কারিগর হতে পারেন ব্রাজিলের বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। রিয়াল মাদ্রিদকে ইউরোপসেরা বানানো ভিনিসিউস জুনিয়র ও রদ্রিগো এখন পুরোপুরি পরিণত ফুটবলার, নেইমারের ফেলে যাওয়া ১০ নম্বর জার্সির চাপ সামলানোর সামর্থ্য তাঁদের রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তরুণ স্ট্রাইকার এনড্রিক, যাঁর গোলক্ষুধা ইতিমধ্যে বিশ্বফুটবলকে চমকে দিচ্ছে। একক তারকা-নির্ভরতার বদলে এই ত্রয়ী মিলে যে বহুমুখী আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেন, তা সামলানো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শুধু আক্রমণভাগ নয়, ব্রাজিলের মাঝমাঠ ও রক্ষণভাগও এখন আগের চেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে খেলা একঝাঁক তরুণ ডিফেন্ডার ও মিডফিল্ডার এখন ব্রাজিলের মূল শক্তি। নেইমার আক্রমণে যে ঘাটতি রেখে গেছেন, দল তা পুষিয়ে নিতে চাইছে কঠোর প্রেসিং ও নিখুঁত পাসিং ফুটবল দিয়ে— অর্থাৎ ব্যক্তিগত জাদুর বদলে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর ভর করে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বড় তারকার বিদায়ের পর ব্রাজিল বারবারই আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরেছে। ১৯৭১ সালে পেলের বিদায়ের পর অনেকে ভেবেছিলেন ব্রাজিলের সোনালি দিন শেষ। কিন্তু পরবর্তীতে জিকো-সক্রেটিসদের নান্দনিক দলগত ফুটবল এবং ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের বিশ্বজয় প্রমাণ করেছে, একক তারকার শূন্যতা দলগত শক্তি দিয়েই পূরণ করা সম্ভব।

নেইমার ব্রাজিলের ফুটবলকে অনেক কিছু দিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল ও ৫৮ অ্যাসিস্ট নিয়ে হয়েছেন সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর অনুপস্থিতি ব্রাজিলকে বাধ্য করবে নতুন এক পরিচয় গড়ে তুলতে— যেখানে দল আর একজনের ওপর নয়, দাঁড়াবে ১১ জনের সম্মিলিত শক্তির ওপর। ‘নেইমার-নির্ভরতা’ থেকে এই মুক্তিই হয়তো হয়ে উঠতে পারে হেক্সা জয়ের পথে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

আরও পড়ুন