কেন ২০২৬ ব্যালন ডি’অর রদ্রির হাতেই উঠছে
বিশ্বকাপ জয় ও গোল্ডেন বল হাতে নিয়ে ফেভারিটের তালিকায় শীর্ষে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার, তবে লড়াই এখনো শেষ হয়নি
২০২৪ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জমকালো অনুষ্ঠানে ব্যালন ডি’অর ট্রফি হাতে উচ্ছ্বসিত স্পেন ও ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার রদ্রি। ছবি: রয়টার্স
২০২৪ সালে যখন রদ্রি রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে পেছনে ফেলে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন, তখন ফুটবল বিশ্বের অনেকেই একে ‘চমক’ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এসে ফুটবল বিশ্ব একবাক্যে স্বীকার করছে— আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়ের নাম রদ্রিগো হার্নান্দেজ ক্যাসকান্তে, সংক্ষেপে ‘রদ্রি’।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করা এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের পর ২০২৬ ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে রদ্রি এখন সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিশ্বকাপে দুর্ভেদ্য রক্ষণের কারিগর
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের রক্ষণভাগ ছিল এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর, যার মূল কারিগর ছিলেন রদ্রি। তার কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা ও রক্ষণাত্মক অবদানের কারণে পুরো টুর্নামেন্টে স্পেন মাত্র একটি গোল হজম করেছে— যা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া যেকোনো দলের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণের গতিপথ আগেভাগে পড়ে ফেলার যে অনন্য ক্ষমতা রদ্রির আছে, তা স্পেনের রক্ষণকে করেছে অভেদ্য।
ফাইনালে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে রদ্রির নেতৃত্বাধীন মাঝমাঠ যে দাপট দেখিয়েছে, তা ফুটবল ইতিহাসে রূপকথা হয়ে থাকবে। পুরো ৯০ মিনিটে আলবিসেলেস্তেদের আক্রমণভাগকে স্পেনের গোলপোস্ট বরাবর একটি শটও নিতে দেননি তিনি। মাঝমাঠ সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে ম্যাচের গতি ও বল দখল নিয়ন্ত্রণ করার এই অসাধারণ পারফরম্যান্সই তাকে ব্যালন ডি’অরের মূল দাবিদার করে তুলেছে।
পরিসংখ্যানেও এগিয়ে রদ্রি
ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের বছরের পারফরম্যান্স সবসময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, আর রদ্রি ২০২৬ বিশ্বকাপে যা করেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি রেকর্ড ৭৯৬টি সফল পাস দিয়েছেন, যার নিখুঁততার হার ছিল ৯৩.২ শতাংশ। স্পেনের রক্ষণভাগকে সুরক্ষা দিতে তিনি করেছেন ২৬টি সফল ট্যাকল ও ইন্টারসেপশন। গোল বা অ্যাসিস্টের চেয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার এই অনন্য দক্ষতার কারণেই ফিফা তাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করে।
ক্লাব ফুটবলেও ধারাবাহিক
বিশ্বকাপের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও রদ্রি ছিলেন পেপ গার্দিওলার দলের মূল ইঞ্জিন। ইনজুরি কাটিয়ে ফিরে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ২১টি ম্যাচে মোট ২০২১ মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি, প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগে তার পাসের নিখুঁততার হার ছিল ৯২ শতাংশ। ‘রদ্রি মাঠে থাকলে ম্যানচেস্টার সিটি ম্যাচ হারে না’—এই পুরোনো প্রবণতা এই মৌসুমেও বজায় ছিল। মাঝমাঠে বল দখল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুতেই নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিখুঁত।
ট্রফির ‘গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ ও ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ব
ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন যারা ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সব বড় ট্রফি একাই জিতেছেন। রদ্রি ইতিমধ্যে জিতেছেন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও প্রিমিয়ার লিগ (ম্যানচেস্টার সিটি), উয়েফা ইউরো ২০২৪ ও ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ (স্পেন), এবং ব্যালন ডি’অর ২০২৪। ২০২৬ সালে আবার এই পুরস্কার জিতলে তিনি জিনেদিন জিদান, জাভি কিংবা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো কিংবদন্তিদের চেয়েও ট্রফি ও ব্যক্তিগত অর্জনে এগিয়ে যাবেন।
ঐতিহাসিকভাবে ব্যালন ডি’অর সবসময় গোলদাতা বা ফরোয়ার্ডদের— যেমন মেসি বা রোনালদোকে—বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু রদ্রি ফুটবলার মূল্যায়নের এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছেন। গোল বা অ্যাসিস্ট ছাড়াই কীভাবে একটি পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা যায়, রদ্রি তার সেরা উদাহরণ। ব্যালন ডি’অরের জুরি বোর্ড এখন শুধু গোলসংখ্যা নয়, বরং দলের জয়ে একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক প্রভাবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেখানে রদ্রির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
তবে এই দৌড়ে রদ্রি একা নন। লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপে, হ্যারি কেইন এবং লিওনেল মেসিও শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে আলোচনায় আছেন। ঐতিহাসিকভাবে ব্যালন ডি'অর সবসময় গোলদাতা বা ফরোয়ার্ডদের বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জুরি বোর্ড দলের জয়ে একজন খেলোয়াড়ের সামগ্রিক প্রভাবকেও গুরুত্ব দিচ্ছে— আর এখানেই রদ্রির শক্তিশালী অবস্থান।
আগামী ব্যালন ডি’অর গালা নাইটে ফ্রান্স ফুটবলের সোনালি ট্রফিটি টানা দ্বিতীয়বারের মতো উঠতে পারে এই স্প্যানিশ মিডফিল্ড জেনারেলের হাতে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে অক্টোবর পর্যন্ত।