EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

ইরাক-ইরানের মতো যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশও বিশ্বকাপ খেলে, শান্তির বাংলাদেশ কেন পারে না?

নতুন কোচ থমাস ডুলির আগমন কি বদলে দিতে পারবে এই সমীকরণ

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ এএম

ইরাক-ইরানের মতো যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশও বিশ্বকাপ খেলে, শান্তির বাংলাদেশ কেন পারে না?

শেখ মোরসালিনের একমাত্র গোলে ভারতকে হারিয়ে ২২ বছর পর প্রতিবেশী দেশটির বিরুদ্ধে জয় পায় বাংলাদেশ। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

১৬ কোটি মানুষের এই দেশে ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা, তা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়। কিন্তু মাঠের উন্মাদনা আর মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যখন আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডায় জমকালোভাবে চলছে, তখন ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবারও পুরনো প্রশ্নটি জেগে উঠেছে— বাঙালির এই ফুটবল আবেগ কি কোনোদিন নিজেদের দলকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে দেখতে পাবে?

সবচেয়ে অস্বস্তিকর তুলনাটা এখানেই। ইরান বা ইরাকের মতো বছরের পর বছর যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিধ্বস্ত দেশগুলোও নিয়মিত বিশ্বকাপ চূড়ান্ত ধাপে লড়াই করছে। অথচ কোনো যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াই বাংলাদেশ ফিফা র‍্যাংকিংয়ে এখন ১৮১তম স্থানে— ২০২৩ সালে যা ছিল ১৯২। উন্নতি হয়েছে সামান্য, কিন্তু এশিয়ার শীর্ষ ২৫টি দলের ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশ।

এশিয়ার প্রতিযোগিতা: সংখ্যা বাড়লেও সুযোগ বাড়েনি

২০২৬ বিশ্বকাপে দল সংখ্যা ৪৮টি হওয়ায় এশিয়ার (এএফসি) স্লট বেড়ে হয়েছিল ৮টি সরাসরি ও ১টি প্লে-অফ, অর্থাৎ মোট ৮.৫। আপাতদৃষ্টিতে এটি বড় সুযোগ মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। জাপান, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, উজবেকিস্তান, জর্ডান ও কাতারের মতো দল প্রথম কয়েকটি স্থান আগেই নিশ্চিত করে ফেলেছিল এবারের আসরে। ইরাক শেষ পর্যন্ত প্লে-অফের সুযোগ পেয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে। এই স্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো অবস্থানেই ছিল না বাংলাদেশ— কারণ সমস্যাটি ছিল দলের সংখ্যার নয়, মেধার পাইপলাইনের।

প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রেও চিত্রটা আশাব্যঞ্জক নয়। এবারের বাছাইপর্বে দ্বিতীয় রাউন্ডেই বাদ পড়ে ভারত— ছয় ম্যাচে মাত্র একটি জয় নিয়ে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে শেষ ম্যাচে কাতারের কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা। তবে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ভারত এখনও বাংলাদেশের চেয়ে ঢের এগিয়ে, ফিফা র‍্যাংকিংয়ে শততমের কাছাকাছি অবস্থান করছে তারা। এরই মধ্যে অবশ্য একটা উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ঘটেছে— গত বছরের নভেম্বরে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভারতকে ১-০ গোলে হারিয়ে টানা ২২ বছরের হারের বৃত্ত ভেঙেছে বাংলাদেশ, শেখ মোরসালিনের গোলে। এই একটি জয় প্রমাণ করে, সামর্থ্য একেবারে নেই তা নয়— ধারাবাহিকতার অভাবটাই মূল সমস্যা।

জাতীয় দলে প্রবাসী ফুটবলারদের আগমন পরিবর্তন আনবে?

বাংলাদেশ ফুটবলে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখাচ্ছে বিদেশি লিগে খেলা প্রবাসী ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তি। ডেনমার্ক প্রবাসী জামাল ভূঁইয়া ২০১৩ সালে পথ দেখানোর পর ফিনল্যান্ড প্রবাসী তারিক কাজী যোগ দেন ২০২১ সালে। এরপর ২০২৪-২৫ সালে একে একে যুক্ত হন কানাডা প্রবাসী শামিত শোম, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জায়ান আহমেদ, ইতালি প্রবাসী ফাহামিদুল ইসলাম, আর সবচেয়ে বড় চমক— ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ক্লাব লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী।

হামজার অন্তর্ভুক্তি নিছক প্রতীকী নয়। ২০২৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে সাত ম্যাচে চার গোল করেছেন তিনি, আর নভেম্বরে ভারতের বিরুদ্ধে সেই স্মরণীয় জয়েও ছিলেন মাঠে। তবে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে— এই বিশ্বমানের প্রতিভাদের অভিজ্ঞতা ঘরোয়া লিগের তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদী ফিটনেস ক্যাম্প এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের খুঁজে বের করার মতো স্থায়ী স্কাউটিং ইউনিট বাফুফের এখনও নেই।

থমাস ডুলি: 'চেজিং নয়, পজেশন ফুটবল'

গত ২২ মে বাফুফে জার্মান-মার্কিন কোচ থমাস ডুলিকে দুই বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দেয়, চার বছরের বেশি সময় দায়িত্বে থাকা হাভিয়ের কাবরেরার বিদায়ের পর। ৬৫ বছর বয়সী ডুলি ৪৩ বছরের ফুটবল অভিজ্ঞতার অধিকারী— খেলোয়াড়ি জীবনে যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে খেলেছেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ছিলেন অধিনায়ক। কোচ হিসেবে ফিলিপাইনকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ফিফা র‍্যাংকিংয়ে, সবশেষ গায়ানার দায়িত্বে থেকে চারটি ম্যাচেই জিতেছেন।

দায়িত্ব নিয়েই ডুলি স্পষ্ট করেছেন তার লক্ষ্য ও দর্শন— 'আমার লক্ষ্য র‍্যাংকিং বাড়ানো। ১৬০, ১৫০... এটা রাতারাতি হয় না, একটা প্রক্রিয়া। বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো ১৬০-এর নিচে নামা, কাল নয়, হয়তো এক বছরে,' বলেছেন তিনি। ফুটবল দর্শন নিয়ে তার ভাষ্য আরও স্পষ্ট— বল তাড়া করা (চেজিং) নয়, বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলাই (পজেশন ফুটবল) তার লক্ষ্য। জুনে সান মারিনোর বিপক্ষে ২-১ গোলে জিতে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রথম জয়ও তুলে নিয়েছে তার দল।

তৃণমূলের সংকট ও ঘরোয়া লিগের জৌলুস হারানো

বিশ্বের প্রতিটি সফল ফুটবল দেশের ভিত্তি তাদের যুব একাডেমি। মরক্কো বা জাপানেও ১০-১২ বছর বয়স থেকে শিশুদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশে এমন কোনো দীর্ঘমেয়াদী কেন্দ্রীয় একাডেমি নেই। একসময় আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ মানেই ছিল সারা দেশে টানটান উত্তেজনা। সেই জৌলুস হারিয়ে এখন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ অনেকটাই দর্শকশূন্য মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় স্টেডিয়াম দীর্ঘদিন সংস্কারের নামে বন্ধ থাকা, ক্লাবগুলোর নিজস্ব অনুশীলন মাঠের অভাব আর শহরের পাড়া-মহল্লার খেলার মাঠ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া— এই সংকট নতুন প্রতিভা উঠে আসার পথ কার্যত বন্ধ করে দিচ্ছে।

এশিয়ার ফুটবলশক্তি বনাম বাংলাদেশ: ব্যবধান যেখানে আকাশ-পাতাল

২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়ার ফুটবল পরাশক্তি জাপান (১৮তম), ইরান (২০তম), দক্ষিণ কোরিয়া (২৫তম) ও অস্ট্রেলিয়া (২৭তম) বিশ্বমঞ্চে লড়ছে। তারা পারলে বাংলাদেশ কেন পারে না— এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে খেলোয়াড়ের মান, পেশাদারিত্ব ও অবকাঠামোর একটা বিশাল অদৃশ্য দেয়ালে।

প্রথম পার্থক্য আন্তর্জাতিক এক্সপোজার। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার স্কোয়াডের সিংহভাগ খেলোয়াড় নিয়মিত ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে (ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, বুন্দেসলিগা, লা লিগা) খেলেন, যেখানে বাংলাদেশের ফুটবলাররা মূলত ঘরোয়া লিগের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, শারীরিক সহনশীলতা ও স্পোর্টস সায়েন্সের ব্যবহার— এশিয়ার শীর্ষ দলগুলো ৯০ মিনিট জুড়ে একই গতিতে প্রেসিং ফুটবল খেলতে পারলেও বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের মধ্যে ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটে স্ট্যামিনার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তৃতীয়ত, একাডেমি সংস্কৃতি— জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি বড় ক্লাবের নিজস্ব একাডেমি আছে, যেখানে অনূর্ধ্ব-৮ থেকে অনূর্ধ্ব-২১ পর্যন্ত খেলোয়াড় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলা হয়— বাংলাদেশে যা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

চতুর্থত, ম্যাচ খেলার সংখ্যা— শীর্ষ দলগুলো বছরে ১২-১৫টি হাই-ইনটেনসিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়, আর ২০২৫ সালে বাংলাদেশ খেলেছে মাত্র আটটি আন্তর্জাতিক ম্যা— এই তথ্য সংসদে খোদ ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ই স্বীকার করেছে।

সোনালি অতীত ছিল, ভবিষ্যতের রোডম্যাপ দরকার

স্বাধীনতার এক বছর পর, ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন মন্ত্রী ইউসুফ আলীর হাতে যাত্রা শুরু করা বাফুফে ১৯৭৪ সালে এএফসি ও ১৯৭৬ সালে ফিফার সদস্যপদ পায়। ১৯৮০ সালে কুয়েতে এএফসি এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন বাংলাদেশ ফুটবলের অন্যতম বড় গৌরব। এরপর ১৯৯৫ সালে ৪-জাতি টাইগার ট্রফি এবং ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে মালদ্বীপকে হারিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়— সেই ম্যাচের পথে সেমিফাইনালে ভারতকেও হারিয়েছিল বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক সময়ে পুরুষ দলের সাফল্য ম্লান হলেও ২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের ফুটবলের নতুন গর্বের জায়গা তৈরি করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

বাংলাদেশ কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলতে পারবে না— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে। তবে তৃণমূল একাডেমি, ঘরোয়া লিগের পেশাদারিত্ব আর বাফুফের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন না এলে সেই স্বপ্ন আগামী ২০ বছরেও অধরাই থেকে যাবে। প্রবাসী প্রতিভা আর নতুন কোচের দর্শনকে যদি দেশের ফুটবল অবকাঠামোর সাথে সঠিকভাবে মেলবন্ধন ঘটানো যায়, তবেই ২০৩৪ বা ২০৩৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে বাংলাদেশ হয়তো একটা সমীহ জাগানো নাম হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন