EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থক সংঘর্ষ: বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাংলাদেশে কেন বাড়ছে রক্তক্ষয়ী ঘটনা?

কুমিল্লায় গোল উদযাপন নিয়ে বিরোধ, প্রাণ গেল ব্রাজিল সমর্থক শরিফুল ইসলামের

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থক সংঘর্ষ: বিশ্বকাপের উন্মাদনায় বাংলাদেশে কেন বাড়ছে রক্তক্ষয়ী ঘটনা?

আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যকার উত্তেজনার প্রতীকী চিত্র। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

লাতিন আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল যখন বিশ্বকাপের মাঠে মুখোমুখি না হয়েও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকে, তখন তার সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশে। চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মাঝপথে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা দেশজুড়ে বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। গত এক সপ্তাহে অন্তত তিনটি জেলায় ঘটেছে সংঘর্ষ, যার একটিতে প্রাণ গেছে একজনের।

কুমিল্লায় কী ঘটেছিল?

গত ৭ জুলাই রাতে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ধনপুর এলাকায় আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচ চলাকালে আর্জেন্টিনা প্রথম গোল হজম করলে ব্রাজিল সমর্থক শরিফুল ইসলাম (৩২) উল্লাস প্রকাশ করেন এবং আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রল-কটাক্ষ করতে থাকেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এ নিয়ে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে স্থানীয় কয়েকজন আর্জেন্টিনা সমর্থক তাঁর ওপর চড়াও হয়ে মারধর করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বাসিন্দা শরিফুল জীবিকার তাগিদে কুমিল্লায় ভাড়া থাকতেন। 

একই রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার তেতৈয়া গ্রামেও একই ম্যাচ ঘিরে সংঘর্ষ বাধে। মিশর গোল করার পর ব্রাজিল সমর্থক মাঈনুদ্দিন মিঠু (৩৫) উল্লাস করলে আর্জেন্টিনা সমর্থক মোহাম্মদ সাকিবের (২০) সঙ্গে তাঁর বাগবিতণ্ডা শুরু হয়, যা পরে হাতাহাতিতে গড়ায়। এতে মিঠুর নাক ও চোখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং সাকিবের মাথা ফেটে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর মিঠুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার চাচড়া গ্রামে ৮ জুলাই রাতে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের সংঘর্ষে মামুন হোসেন (২২) নামে একজন আহত হন। এর আগে ২ জুলাই সাভারের আশুলিয়ায় ব্রাজিল-জাপান ম্যাচ নিয়ে বিরোধের জেরে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মরদেহ গুম করার অভিযোগও ওঠে, যা দেখায় সমস্যাটি শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়— পুরো বিশ্বকাপ মৌসুমেই সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতার প্রবণতা বেড়েছে।

কেন খেলা নিয়ে এত হিংস্র হয়ে ওঠেন সমর্থকরা?

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ফুটবলে বড় অর্জন না থাকায় তরুণ সমর্থকরা আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় জুড়ে দেন। প্রিয় দলের জয়-পরাজয়কে তাঁরা নিজের ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।

সমমনা দর্শকদের সঙ্গে দলবদ্ধভাবে খেলা দেখার সময় আবেগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়, ফলে প্রতিপক্ষ সমর্থককে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, শত্রু ভাবতে শুরু করেন অনেকে।

এছাড়া, ম্যাচ শেষ হতে না হতেই জয়ী দলের সমর্থকরা পরাজিত পক্ষকে নিয়ে অবমাননাকর ট্রল, মিম ও উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে দেন সামাজিক মাধ্যমে। এই অনলাইন উসকানিই পরে বাস্তব জীবনে হাতাহাতি ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে বলে একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে।

আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশি সমর্থকদের ভালোবাসাকে বিদেশেও ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও, এই সমর্থনকে কেন্দ্র করে মৃত্যু ও রক্তপাতের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পৌঁছালে তা দেশের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পারিবারিক-সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে এবং আইনি জটিলতায় জড়িয়ে অনেক তরুণের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়ছে।

সমাধানের পথ কী?

  • পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খেলাকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি
  • সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্টের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি নজরদারি
  • দেশীয় ফুটবল লিগ ও স্থানীয় ক্লাব ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তরুণদের আবেগকে ইতিবাচক চ্যানেলে প্রবাহিত করা

ফুটবলের সৌন্দর্য মেলবন্ধনে, বিভেদে নয়। আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অর্থ প্রতিবেশী কিংবা সহনাগরিকের ওপর চড়াও হওয়া হতে পারে না। এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দের বদলে ক্রমেই আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন