EN ☀️
×

Follow Us

খেলা

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আজ মাঠে নামছেন রোনালদো

ডিওগো জোতার স্মৃতি আর এলিট মিডফিল্ডকে সঙ্গী করে ৪১ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে আজ মাঠে নামছেন রোনালদো

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

‘পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাস আসলে কোনো সরলরেখা নয়, এটা এক বিষাদসিন্ধু। যার এক কূলে পরম প্রাপ্তি আর অন্য কূলে আটলান্টিক মহাসাগরের মতো বিশাল দীর্ঘশ্বাস।’— বিখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক জোনাথন উইলসনের এই উক্তিটিই যেন পর্তুগালের ফুটবলীয় দর্শনের মূল কথা।

লিসবনের বেলেম টাওয়ার থেকে আটলান্টিকের দিকে তাকালে যে বিষণ্নতা জাগে, ফুটবল মাঠেও পর্তুগালের গল্পটা ঠিক তেমনই; দিগন্ত ছুঁতে ছুঁতে ফিরে আসা। কিন্তু এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে সেই দীর্ঘশ্বাসকে উল্লাসে রূপ দেওয়ার অন্তিম অভিযানে নামছে সেলেসাওরা।

আজ বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ২০২৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের মিশন। আর এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ৪১ বছর বয়সী এক কিংবদন্তি পা রাখছেন তাঁর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এটা কি তাঁর শেষবার, নাকি শেষের শুরু?

১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে যখন ‘কালো চিতা’ ইউসেবিও ডি-বক্সের বাইরে থেকে বুলেটের মতো শটে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপাতেন, তখনই বিশ্ব প্রথম চিনেছিল পর্তুগালকে। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ইউসেবিওর একার চার গোলে ৫-৩ ব্যবধানের সেই অবিশ্বাস্য জয় এখনো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গল্প। তবে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে ইউসেবিওর কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটি পর্তুগিজ ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক ও বিষাদময় ছবি হয়ে আছে।

এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর বিশ্বকাপে জায়গা পায়নি পর্তুগাল। নব্বইয়ের দশকে লুইস ফিগো, রুই কোস্তা, দেকোদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল পর্তুগালের ‘স্বর্ণালী প্রজন্ম’। তাঁদের কাব্যিক ফুটবল পজিশন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেও ট্রফি ভাগ্য খোলেনি। ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে ঘরের মাঠে গ্রিসের রক্ষণাত্মক ফুটবলের কাছে সেই হার লিসবনের আকাশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই না পাওয়ার বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক নতুন জেদ, যার নাম— ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ ছিল পর্তুগালের ইতিহাসের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। একদিকে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থাকা লুইস ফিগো, অন্যদিকে ২১ বছরের তরুণ রোনালদো। সেই আসরেই নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পর্তুগাল খেলেছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ম্যাচ ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’। ১৬টি হলুদ কার্ড ও ৪টি লাল কার্ডের সেই আদিম যুদ্ধে ডাচ ডিফেন্ডারের ট্যাকলে চোখের জল ফেলে মাঠ ছাড়েন রোনালদো। তবে পর্তুগাল মচকায়নি। সেবার ইউসেবিওর পর দীর্ঘ ৪০ বছর পর পর্তুগাল সেমিফাইনালে উঠলেও জিনেদিন জিদানের ফ্রান্সের কাছে হেরে অবসান ঘটে ফিগো যুগের।

এরপরের দেড় দশক জুড়ে গল্পটা শুধুই রোনালদোর একার কাঁধে এক দলকে টেনে নেওয়ার। ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে রোনালদোর কাঁদতে কাঁদতে টানেল দিয়ে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য— সবখানেই ছিল ট্র্যাজেডি। পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, একটি ইউরো ও নেশনস লিগ জেতা রোনালদোর ক্যাবিনেটে কেবল এই একটি ট্রফিই অধরা।

গত জুলাইয়ে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় লিভারপুলের ২৮ বছর বয়সী পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড ডিওগো জোতা চিরতরে হারিয়ে যান। কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তাই এবারের বিশ্বকাপ দল ঘোষণার সময় আবেগী কণ্ঠে বলেন— ‘এটি আমাদের ২৭ প্লাস এক জনের দল। ডিওগো জোতা আমাদের শক্তি, আমাদের আনন্দ। তার স্বপ্নটাই এখন আমাদের লড়াইয়ের জ্বালানি।’ জোতার এই অদৃশ্য স্মৃতিই এখন দলটিকে মানসিকভাবে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।

বিখ্যাত ফুটবল লেখক মাইকেল কক্স দেখিয়েছেন, আধুনিক ফুটবলে ম্যাচ জেতা বা হারা নির্ধারিত হয় মাঝমাঠের ট্যাকটিক্যাল কৌশলে। সাবেক কোচ ফার্নান্দো সান্তোসের রক্ষণাত্মক ফুটবল থেকে বের করে এনে পর্তুগালকে ৪-৩-৩ ফরমেশনে আক্রমণাত্মক রূপ দিয়েছেন রবার্তো মার্তিনেজ।

ব্রুনো ফার্নান্দেজ: ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তারকা সদ্য সমাপ্ত প্রিমিয়ার লিগে থিয়েরি অঁরির সর্বোচ্চ ২০টি অ্যাসিস্টের রেকর্ড ভেঙে এফডব্লিউএ ‘ফুটবলার অব দ্য ইয়ার’ হয়েছেন। মার্তিনেজের সিস্টেমে তিনি খেলবেন ফ্রি রোল বা নাম্বার টেন পজিশনে, যাঁর মূল কাজ হবে রোনালদোর জন্য ডি-বক্সে বলের জোগান দেওয়া।

ভিতিনিয়া ও হোয়াও নেভেস: পিএসজির এই দুই তরুণ তুর্কি মাঝমাঠের টেম্পো ও গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন। চাপের মুখেও বল পজিশন ধরে রাখতে ভিতিনিয়া এবং হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে ব্যাকলাইন ও উইংয়ের সংযোগ ঘটাতে নেভেস বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা।

বের্নার্দো সিলভা: ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে পেপ গার্দিওলার অধীনে লিগ জেতা এই ফুটবলার রাইট উইং বা মাঝমাঠের যেকোনো পজিশনে কোচের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

২০০৪ সালে হোসে মরিনহোর এফসি পোর্তোর চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় এবং একই বছর ইউরো আয়োজন পর্তুগিজ ফুটবলের আধুনিকায়নের টার্নিং পয়েন্ট ছিল। দেশের ‘বিগ থ্রি’— বেনফিকা, স্পোর্টিং সিপি এবং এফসি পোর্তোর একাডেমিগুলোর আধুনিকায়নের ফলেই আজ বিশ্বমানের ফুটবলার পাচ্ছে পর্তুগাল।

ডিফেন্সে ম্যানচেস্টার সিটির রুবেন দিয়াস, স্পোর্টিং সিপির গঞ্জালো ইনাসিও এবং পিএসজির নুনো মেন্ডেসের পাশাপাশি ম্যান সিটির ম্যাথিউস নুনেসকে ‘ইনভার্টেড ফুলব্যাক’ হিসেবে ব্যবহার করছেন মার্তিনেজ, যা পেপ গার্দিওলার সফল কৌশলেরই প্রতিচ্ছবি। গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন পোর্তোর লড়াকু মানসিকতার প্রতীক দিওগো কোস্তা।

তারকাখচিত দল হলেও জোনাথন উইলসনের মতে, দলে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সরাসরি ধ্বংস করার মতো শারীরিক শক্তিসম্পন্ন প্রথাগত ‘ডেস্ট্রয়ারের’ অভাব রয়েছে। এছাড়া, ৪১ বছর বয়সে রোনালদোকে যখন ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে খেলানো হবে, তখন আধুনিক ফুটবলের হাই-প্রেসিং গেমের ঘাটতি মেটাতে উইঙ্গার রাফায়েল লেয়াও বা ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওদের প্রচুর ট্র্যাকিং ব্যাক করতে হবে। অন্যদিকে, হোয়াও ফেলিক্স বা গঞ্জালো রামোসের মতো তারকাদের ডাগআউটে বসিয়ে রেখে ড্রেসিংরুমের ইগো ম্যানেজমেন্ট করাটাও মার্তিনেজের জন্য বড় পরীক্ষা।

বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘কে’- তে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ কঙ্গো, উজবেকিস্তান ও কলম্বিয়া। আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও কলম্বিয়ার হামেস রদ্রিগেজ ও লুইস দিয়াজদের মোকাবিলা করা সহজ হবে না। এছাড়া উত্তর আমেরিকার ভিন্ন টাইম জোন ও আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে ইতিমধ্যেই ফ্লোরিডার পাম বিচে কন্ডিশনিং ক্যাম্প করেছে দলটি।

এক সময় পর্তুগালের একনায়ক আন্তোনিও সালাজার দেশের মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ‘থ্রি এফ’ (ফাদো বা সঙ্গীত, ফাতিমা বা ধর্ম, ফুতবল বা ফুটবল) নীতি ব্যবহার করতেন। সেই শৃঙ্খল ভেঙে ফুটবল আজ পর্তুগালের জাতীয় গৌরবের প্রতীক। ইউসেবিও পারেননি, ফিগো হাতছোঁয়া দূরত্ব থেকে ফিরে এসেছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর সামনে জোনাথন উইলসনের সেই ‘বিষাদসিন্ধু’ পার হয়ে উত্তর আমেরিকার মাটিতে ক্যারিয়ারের শেষ মহাকাব্যটি লেখার এটাই অন্তিম সুযোগ।

আরও পড়ুন