যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির ধারায় পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির
ডেইলি সান রিপোর্ট, লালমনিরহাট
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকায় একই আঙিনায় মসজিদ-মন্দির। ছবি: সংগৃহীত
যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হয়ে একই আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে আছে মন্দির ও মসজিদ। সম্প্রীতির এ দৃষ্টান্ত রয়েছে লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকায়। দুই ধর্মীয় উপাসনালয়ের অবস্থান মাত্র ৬ ফুট ব্যবধানে।
মন্দিরটির নাম কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দূর্গা ও কালী মন্দির। মসজিদটির নাম পুরান বাজার জামে মসজিদ।
একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ জন মন্দিরে পুজার্চনা করেন আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন মসজিদে নামাজ আদায় করেন। মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় মন্দিরে বন্ধ রাখা হয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো।
একপাশে উলুধ্বনি, অন্য পাশে চলছে আল্লাহ তাআলার জিকির। এভাবে ধর্মীয় সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যুগ যুগ ধরে চলছে পৃথক দুটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে।
একপাশে ধূপকাঠি, অন্য পাশে আতরের সুঘ্রাণ। যুগ যুগ ধরে একই আঙ্গিনায় মন্দির-মসজিদে পৃথক ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মচর্চা করে আসছেন। এ পর্যন্ত এখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়নি কোনো বিবাদ।
স্থানীয় বাসিন্দা, মসজিদ ও মন্দির সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের পুরান বাজারে ১৮৩৬ সালে প্রথম কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১৫ সালের দিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নামাজ পড়ার জন্য মন্দিরের পাশে একই আঙিনায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ তৈরি করা হয়। পরে সেটি জুমা মসজিদে রূপান্তরিত হয়, যেটি পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিত। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীমন্দিরের পাশে দুর্গামন্দির স্থাপিত হয়।
এই সম্প্রীতির নির্দশন মন্দির ও মসজিদ দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছে সাধারণ মানুষ। কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতও এই মন্দির ও মসজিদ পরিদর্শনে এসেছিলেন। একই সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন মন্দিরে পুজার্চনা করেন আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন মসজিদে নামাজ আদায় করেন।
পুরান ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী আরিফ সাবেরী (৫৫), মনোয়ার হোসেন,(৪৫) এবং কমল চন্দ্র রায়, (৪৮) বলেন, তারা একই আঙ্গিনায় মসজিদ- মন্দিরের কথা শুনে তা দেখতে ছুটে আসেন। এটি দেখে তারা সকলেই মুগ্ধ হয়েছেন। কয়েক যুগ ধরে একই আঙ্গিনায় দুটি পৃথক ধর্মের পৃথক দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু কোনো দিনই কোনো ধর্মের মানুষের মাঝে সম্প্রীতির ঘাটতি হয়নি। এটি সত্যি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা ।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, আজানের সময় থেকে নামাজের জামাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের ঢাকঢোলসহ যাবতীয় শব্দ যন্ত্র বন্ধ থাকে। নামাজ শেষ হলে মন্দিরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলাও হয় না। শালীনতা ও ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে একই উঠানে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন উভয় ধর্মের মানুষ।
নামাজ শেষ করে উঠানে পা রাখতেই চোখে পড়বে মন্দিরের দেবী দুর্গার প্রতিমা। একইভাবে পূজারীরাও পূজা করতে এসে মুসলমানদের নামাজের দৃশ্য দেখতে পারে।
মন্দিরের পূজারি দিলীপ চন্দ্র রায় বলেন, লালমনিরহাটে ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এ সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করছেন তারা। সত্যি এটি আমাদের জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়।
কালীবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আমিরুল হায়াত মুকুল জানান, এই মসজিদটি ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এলাকার নামকরণও করা হয় কালীবাড়ী। সেই থেকে এক উঠানে চলছে দুই ধর্মের দুই উপাসনালয়ের কার্যক্রম। এখানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি কখনো।
কালীবাড়ী মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে মন্দিরে নির্বিঘ্নে ধর্মচর্চা করতে আমরা সবসময়ই সহযোগিতা দিয়ে থাকি। একই আঙ্গিনায় মন্দির-মসজিদ শুধু লালমনিরহাটের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য ধর্মীয সম্প্রীতির এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।
মসজিদ ও মন্দির কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই আঙ্গিনায় মন্দির-মসজিদ থাকলেও আঙ্গিনাটির মালিক অন্যজন। মন্দিরটি রয়েছে ৮ শতাংশ জমিতে আর মসজিদটি রয়েছে পাঁচ শতাংশ জমিতে। আঙ্গিনার জমির পরিমান ১২ শতাংশ।
পুরান বাজার জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আল আজাদ বলেন, ঐতিহ্যবাহী পুরান বাজার একসঙ্গে দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মসজিদের আগে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবুও এখানে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ স্বাধীনভাবে ঘুরতে আসে। আমরা তাদের সব কাজে সহযোগিতা করি। তারাও আমাদের সহযোগিতা করেন। নামাজের সময় মন্দিরের ঢাক-ঢোল বন্ধ রাখা হয়। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে চলছে এ সম্প্রীতির বন্ধন।
এদিকে লালমনিরহাটে এবার ৪৭৬টি পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল রায় জানান, পূজামণ্ডপের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪৭৬টি মণ্ডপের জন্য মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা যায়, জেলার পাঁচ উপজেলায় মোট ৪৭৬টি মণ্ডপের মধ্যে লালমনিরহাট সদরে ১৬২টি, আদিতমারীতে ১১৭টি, কালীগঞ্জে ৯৩টি, হাতীবান্ধায় ৭৩টি এবং পাটগ্রামে ৩১টি মণ্ডপ রয়েছে।