নবীযুগে মদিনায় মুনাফিকদের কর্মকাণ্ড ও পরিচয়
ধর্ম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মুনাফিক শব্দটি ‘নফক’ শব্দ থেকে এসেছে। নফকের অর্থ গর্ত, ছিদ্র, সুড়ঙ্গ, বের হওয়া, খরচ করা বা ব্যয় করা। কারও মতে, ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ (পাহাড়ি ইঁদুর) থেকে মুনাফিক শব্দটির উৎপত্তি। পাহাড়ি ইঁদুরকে ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ বলা হয়। কারণ এটি অত্যন্ত ধূর্ত প্রাণী এবং পাহাড়ে অনেক গর্ত তৈরি করে।
এদের ধরার জন্য একটি গর্তে পানি বা অন্য কোনো উপাদান দিলে অন্য গর্ত দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যায়। ফলে এদের সহজে ধরা বা মারা যায় না। মুনাফিকও অনেকটা এমনই। তাদের সহজে চেনা যায় না।
মুনাফিক হলো এমন ব্যক্তি, যে মুখে ইসলাম প্রকাশ করে, কিন্তু অন্তরে কুফর লুকিয়ে রাখে।
নিফাক বা মুনাফিকি দুই ধরনের—বিশ্বাসগত ও কর্মগত। বিশ্বাসগত মুনাফিকি হলো অন্তরে কুফর রেখে নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করা। এ ধরনের মুনাফিকির কারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। অন্যদিকে কর্মগত মুনাফিকির মধ্যে রয়েছে আমানতের খিয়ানত করা, মিথ্যা বলা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, গালিগালাজ করা ইত্যাদি। এসব কাজ মুনাফিকির বৈশিষ্ট্য হলেও এর কারণে কেউ ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় না।
আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ৮ থেকে ২০ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সুরায় আরও ৩৮টি আয়াতে মুনাফিকদের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মদিনার মুনাফিকদের শ্রেণিবিভাগ
মদিনায় মুনাফিকদের সংখ্যা প্রায় ৩৭০ জন পুরুষ ও নারী ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিরোধ ও ষড়যন্ত্র সৃষ্টি করত। তবে ওহির মাধ্যমে সমর্থিত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে এমন প্রজ্ঞা, শক্তি ও দূরদর্শিতা দান করেছিলেন, যা তার আগে বা পরে কোনো নেতার মধ্যে এত ব্যাপকভাবে একত্রিত হয়নি।
মদিনার মুনাফিকদের মধ্যে আহলে কিতাবের কিছু লোকও ছিল, যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু অন্তরে কুফর লুকিয়ে রেখেছিল। এ ছাড়া আওস ও খাজরাজ গোত্রের কিছু লোক এবং মদিনার আশপাশের মরুচারী আরবদের একটি দলও মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মদিনার যুগে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও নানা ষড়যন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুনাফিকের নাম নিচে দেওয়া হলো।
আওস ও খাজরাজের মুনাফিকরা
আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল: তিনি ছিলেন মুনাফিকদের নেতা। তার ব্যাপারে সুরা আল-মুনাফিকুন নাজিল হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সুরা হাশরের ১১ থেকে ১৭ নম্বর আয়াত, ইফকের ঘটনা-সম্পর্কিত সুরা নূরের আটটি আয়াত এবং আরও অনেক আয়াতের সঙ্গে তার সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাস ইবনু সুয়াইদ ইবনুস সামিত: তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার এই বাণী নাজিল হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে—‘তারা আল্লাহর নামে শপথ করে যে তারা কিছু বলেনি; অথচ তারা অবশ্যই কুফরির কথা বলেছে।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ৭৪)
হারিস ইবনু সুয়াইদ: তার ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—‘আল্লাহ কীভাবে এমন জাতিকে হেদায়াত করবেন, যারা ঈমান আনার পর কুফরি করেছে এবং সাক্ষ্য দিয়েছিল যে রাসুল সত্য...।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৬)
বিজাদ ইবনু উসমান ইবনু আমির ও নাবতাল ইবনুল হারিস: তাদের ব্যাপারে এই আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—‘তাদের মধ্যে এমন লোক আছে, যারা নবীকে কষ্ট দেয় এবং বলে, তিনি তো সব কথা শোনেন। বলুন, তিনি তোমাদের কল্যাণের কথাই শোনেন...।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ৬১)
জুওয়াই ইবনুল হারিস: তিনি আওস গোত্রের ছিলেন।
আবু হাবিবা ইবনুল আজআর: তিনি মসজিদে দিরার নির্মাণকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন। তারা হলেন—খিজাম ইবনু খালিদ, আব্বাদ ইবনু হুনাইফ, আমর ইবনু খিজাম, জারিয়া ইবনু আমির, তার দুই ছেলে মুজাম্মি ও জায়েদ এবং ওয়াদিয়া ইবনু সাবিত।
তাদের প্রসঙ্গে সুরা আত-তাওবার ১০৭ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে—‘আর যারা ক্ষতিসাধন, কুফরি, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং আগে আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী ব্যক্তির জন্য ঘাঁটি হিসেবে একটি মসজিদ গ্রহণ করেছে...।’
আওস ইবনু কায়জি: তার ব্যাপারে সুরা আল-আহজাবের ১৩ নম্বর আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি মিরবাআ ইবনু কায়জির ভাই ছিলেন। মিরবাআকেও মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত বলা হয়।
আবু তুমা বশির ইবনু উবাইরিক: দুটি বর্ম চুরির ঘটনার সঙ্গে তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার ব্যাপারে সুরা আন-নিসার ১০৭ নম্বর আয়াতের কথা বলা হয়—‘আর যারা নিজেদের সঙ্গে খিয়ানত করে, তুমি তাদের পক্ষে বিতর্ক করো না।’
কায়স ইবনু আমর ইবনু সাহল, আমর ইবনু কায়স, যায়েদ ইবনু আমর ও রাফি ইবনু ওয়াদিয়া: তারা সবাই খাজরাজের বনু নাজ্জার গোত্রের ছিলেন।
জাদ্দ ইবনু কায়স: তার ব্যাপারে সুরা আত-তাওবার ৪৯ নম্বর আয়াত নাজিল হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। আয়াতটিতে বলা হয়েছে—‘তাদের মধ্যে কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে পরীক্ষায় ফেলবেন না।’
ইহুদি ধর্মীয় নেতাদের মধ্যকার মুনাফিক
এদের মধ্যে ছিলেন সাদ ইবনু হুনাইফ, জায়েদ ইবনুল লাসিত, নুমান ইবনু আওফা ইবনু আমর ও উসমান ইবনু আওফা। তাঁরা সবাই বনু কায়নুকা গোত্রের ছিলেন বলে জানা যায়।
এ ছাড়া রাফি ইবনু হুরাইমিলাকে মুনাফিকদের অন্যতম বড় নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তালিকায় আরও ছিলেন রিফাআ ইবনু জায়েদ ইবনুত তাবুত, সিলসিলা ইবনু বারহাম ও কিনানা ইবনু সুরাইয়া।
অন্যান্য মুনাফিক
আসমা বিনতে মারওয়ান: তাকে মদিনার মুনাফিকদের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আখনাস ইবনু শারিক আস-সাকাফি: তিনি সাকিফ গোত্রের ছিলেন। তার বাহ্যিক অবয়ব আকর্ষণীয় এবং কথাবার্তা ছিল মিষ্টি। তার ব্যাপারে সুরা আল-বাকারার ২০৪ নম্বর আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতটিতে বলা হয়েছে—‘মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে, যার পার্থিব জীবনের কথাবার্তা তোমাকে মুগ্ধ করে এবং সে তার অন্তরের বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী করে; অথচ সে সবচেয়ে কঠিন বিরোধী।’
এগুলো মদিনায় মুনাফিকদের কর্মকাণ্ড, ষড়যন্ত্র এবং ফিতনা-ফ্যাসাদে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকজনের নাম।
