EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস, মতভেদ ছড়াল যেভাবে

আল-আমিন বিন আলী

আল-আমিন বিন আলী

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের ইতিহাস, মতভেদ ছড়াল যেভাবে

ছবি সংগৃহীত

অ অ

ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের সূচনা নিয়ে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিনের মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই তাঁর জন্মদিনকে স্মরণ করেছেন। অন্যদের মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে মিলাদুন্নবী পালনের শুরু ফাতেমীয় আমলে। তাঁদের কাছে এটি একটি বিদআত।

মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে সম্মিলিত জিকির, নাত ও কোরআন তিলাওয়াত, মিষ্টি বিতরণ এবং রাস্তা ও বিভিন্ন চত্বর সাজানো।

মহানবী (সা.)-এর সময় থেকেই কি প্রচলন ছিল?

অনেক মুসলমান মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর সময় থেকেই তাঁর জন্মের বিষয়টি স্মরণ করার প্রচলন ছিল। এর পক্ষে তাঁরা তাঁর সোমবারের রোজার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) সোমবার রোজা রাখতেন। এ দিন সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, এই দিনেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন।

তবে অন্য একটি মত হলো, মিলাদুন্নবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপনের প্রচলন অনেক পরে শুরু হয়। এ মত অনুযায়ী, ফাতেমীয় আমলে এর সূচনা হয়।

ফাতেমীয় আমলে মিলাদ

ফাতেমীয়রা প্রথম মিলাদুন্নবী উদযাপন শুরু করেন বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিসরে প্রবেশের পর ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ লিদিনিল্লাহর শাসনামলে এর সূচনা হয় বলে কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

কিছু ইতিহাসবিদের মতে, মিসরীয়দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির একটি উপায় হিসেবেও আল-মুইজ লিদিনিল্লাহ এই আয়োজন ব্যবহার করেছিলেন। কারণ, ধর্মীয় এই উপলক্ষের সঙ্গে আনন্দ ও উৎসবের আবহ যুক্ত ছিল।

তবে তখনকার আয়োজন বর্তমান সময়ের মতো ছিল না। মূলত মিষ্টি ও সদকা বিতরণের মধ্যেই তা সীমিত থাকত।

আনুষ্ঠানিক আয়োজনের অংশ হিসেবে মানুষ কাজি আল-কুজাতের মিছিলের সঙ্গে অংশ নিত। এরপর সবাই আল-আজহার মসজিদের দিকে যেত। বিভিন্ন প্রতিনিধিদল সেখান থেকে খলিফার প্রাসাদে যেত। সেখানে বক্তৃতা দেওয়া হতো এবং খলিফার জন্য দোয়া করা হতো। পরে সবাই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেত।

মিলাদুন্নবীর পাশাপাশি ফাতেমীয়রা ইমাম আলী, সাইয়্যিদা ফাতিমা জাহরা এবং তৎকালীন ফাতেমীয় ইমামের জন্মও উদযাপন করত। অবশ্য খলিফা আল-মুস্তালি বিল্লাহর শাসনামলে এসব আয়োজন বাতিল করা হয়।

বর্তমানে শিয়া মুসলমানরাও মিলাদুন্নবী পালন করেন। তবে সুন্নিদের তুলনায় তাঁরা ভিন্ন দিনে এটি পালন করেন। শিয়াদের বিশ্বাস, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের ১৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।

সুন্নিদের মধ্যে প্রথম মিলাদ উদযাপন

অনেকের ধারণা, মিলাদুন্নবী উদযাপন ফাতেমীয়দের চালু করা একটি বিদআত। তাঁদের মতে, ফাতেমীয়দের আগে বা পরে আহলে সুন্নতের মধ্যে এ ধরনের আয়োজনের প্রচলন ছিল না।

তবে ইতিহাসবিদ ও ফকিহ জালালুদ্দিন আস-সুয়ুতির মত ভিন্ন। তাঁর হাসানুল মাকসিদ ফি আমালিল মাওলিদ গ্রন্থে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত মিলাদুন্নবীর মতো আয়োজন প্রথম করেছিলেন আরবিলের শাসক বাদশা মুজাফফররুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরী। তিনি ছিলেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময়ের শাসক।

বাদশা মুজাফফরের উত্তম চরিত্র ও উদারতার প্রশংসা করেছেন অনেক আলেম। তাঁরা তাঁর মিলাদুন্নবী উদযাপনের নানা দিকও তুলে ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইবনে কাসির, হাফেজ আজ-জাহাবি, সিবত ইবনে আল-জাওজি ও ইবনে খাল্লিকান।

ইবনে কাসির তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে মুজাফফরকে দানশীল ও মর্যাদাবান শাসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অনেক ভালো কাজের কথাও বলেছেন। তিনি একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।

মিলাদুন্নবীর আয়োজন সম্পর্কে ইবনে কাসির বলেন, মুজাফফর রবিউল আউয়াল মাসে মহানবী (সা.)-এর জন্ম উপলক্ষে বড় আয়োজন করতেন।

সিবত ইবনে আল-জাওজি তাঁর বর্ণনায় ওই আয়োজনের ব্যাপকতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর কাছে একজন ব্যক্তি একটি মিলাদের খাবারের বিশাল আয়োজনের বর্ণনা দিয়েছিলেন। সেখানে ৫ হাজার ভেড়ার মাথা ভুনা, ১০ হাজার মুরগি, ১ লাখ বাটি খাবার এবং ৩০ হাজার প্লেট মিষ্টি পরিবেশন করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

মিলাদে বিশিষ্ট আলেম ও সুফিরা উপস্থিত হতেন। মুজাফফর তাঁদের উপহার ও অর্থ দিতেন। সুফিদের জন্য দুপুর থেকে ভোর পর্যন্ত সামা বা ধর্মীয় সংগীতের আয়োজন করা হতো। তিনি নিজেও তাঁদের সঙ্গে নৃত্যে অংশ নিতেন বলে বর্ণনায় এসেছে।

বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অতিথিদের থাকার জন্য তাঁর একটি অতিথিশালাও ছিল।

হাফেজ আজ-জাহাবিও তাঁর সিয়ারু আলামিন নুবালা গ্রন্থে মুজাফফরের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মুজাফফর দান-সদকা পছন্দ করতেন। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রুটি বিতরণ করতেন। প্রতিবছর বহু মানুষকে পোশাক দিতেন।

নারী, এতিম ও পথশিশুদের জন্য তিনি আলাদা ভবন নির্মাণ করেছিলেন বলেও আজ-জাহাবির বর্ণনায় রয়েছে। তিনি হাসপাতালের রোগীদের দেখতে যেতেন। পথচারী ও মুসাফিরদের জন্য তাঁর অতিথিশালা ছিল। সেখানে প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করা হতো।

শাফেয়ি ও হানাফি মাজহাবের জন্য তিনি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করেছিলেন।

মিলাদুন্নবীর আয়োজন সম্পর্কে আজ-জাহাবি আরও বলেন, ইরাক ও জাজিরা অঞ্চল থেকে মানুষ মুজাফফরের কাছে আসত। তাঁর ও আমিরদের জন্য কাঠের গম্বুজ বা প্যাভিলিয়ন তৈরি করে সাজানো হতো। সেখানে বাদ্যযন্ত্র ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন থাকত।

প্রতিদিন বিকেলে মুজাফফর সেখানে যেতেন। তিনি প্রতিটি প্যাভিলিয়নে দাঁড়িয়ে এসব আয়োজন দেখতেন। কয়েক দিন ধরে চলত এই আয়োজন।

বিপুলসংখ্যক গরু, উট ও ভেড়া জবাই করে খাবার রান্না করা হতো। সুফিদের জন্য একাধিক পোশাকের সেট প্রস্তুত করা হতো। মাঠে ধর্মীয় বক্তারা বক্তব্য দিতেন। এ উপলক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হতো।

উসমানীয় আমলেও ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন

উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময়ও মিলাদুন্নবী উদযাপন করা হতো। মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও উপলক্ষের প্রতি উসমানীয় সুলতানরা বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

প্রধান আয়োজন হতো সুলতানের নির্বাচিত কোনো বড় মসজিদে। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও আলেমরা আনুষ্ঠানিক পোশাক ও বুকে পদক পরে মসজিদের প্রবেশপথে উপস্থিত থাকতেন। তাঁরা সুলতানের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

সুলতান সবচেয়ে ভালো ঘোড়াগুলোর একটিতে চড়ে মসজিদে আসতেন। ঘোড়ার জিন খাঁটি সোনার তৈরি থাকত। তাঁকে ঘিরে থাকত জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা।

শোভাযাত্রায় পতাকা বহন করা হতো। উসমানীয় সেনাবাহিনীর দুই সারি সৈন্যের মধ্য দিয়ে তা এগিয়ে যেত। পেছনে থাকত সাধারণ মানুষের ভিড়।

এরপর সবাই মসজিদে প্রবেশ করতেন। শুরু হতো আনুষ্ঠানিকতা।

প্রথমে কোরআন তিলাওয়াত করা হতো। এরপর মহানবী (সা.)-এর জন্মকাহিনি পাঠ করা হতো। পরে নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের জন্য দালায়িলুল খায়রাত গ্রন্থ পাঠ করা হতো।

কয়েকজন শায়খ এরপর জিকিরের আসরে বসতেন। নাত ও ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনকারীরা নাশিদ পাঠ করতেন। নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের ধ্বনি উঠত।

এসব আয়োজন হতো রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখের আগের রাতে। আর মিলাদুন্নবীর দিন সকালে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সুলতানকে শুভেচ্ছা জানাতে আসতেন।

মিলাদুন্নবী নিয়ে ফিকহি মতভেদ

মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে ফকিহদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। কেউ এর পক্ষে। কেউ এটিকে অপছন্দ করেন। আবার কেউ কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করেন।

কিছু ফকিহের মতে, এটি বিদআতে হাসানাহ বা ভালো ও প্রশংসনীয় বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের যুক্তি, এর মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা প্রকাশ করা হয়। তাঁর জন্মে আনন্দ ও খুশিও প্রকাশ করা হয়।

এই মতের আলেমদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম সুয়ুতি, ইবনে হাজার আল-আসকালানি, সাখাওয়ি, ইবনে আবেদিন, শামসুদ্দিন ইবনে আল-জাজারি, ইমাম নববী ও কাস্তাল্লানি।

অন্যদিকে, মিলাদুন্নবীর আয়োজনের বিরোধিতা করেছেন ইবনে তাইমিয়া, আশ-শাতিবি ও তাজুদ্দিন আল-ফাকিহানি। তাঁদের মতে, এটি এমন একটি বিদআত, যা পূর্ববর্তী আলেমরা পছন্দ করেননি এবং পালনও করেননি।

বর্তমানে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মতভেদ সালাফি ও সুফিদের মধ্যে প্রচলিত ফিকহি মতপার্থক্যের অন্যতম বিষয়। কখনো কখনো এই মতভেদ তাকফির বা কাউকে কাফের ঘোষণার পর্যায়েও পৌঁছেছে।

সুফি তরিকা ও বিভিন্ন গোষ্ঠী মিলাদুন্নবী উদযাপনে বেশি গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে সালাফিরা সাধারণত এটিকে বিদআত হিসেবে দেখেন।

সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজের মতে, শরিয়তে মিলাদুন্নবী উদযাপনের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। মহানবী (সা.) নিজে এটি উদযাপন করেননি। সাহাবিরাও তা করেননি। তাই তাঁর মতে, এটি একটি বিদআত।

মিলাদুন্নবীর ইতিহাস নিয়ে তাই মুসলিম সমাজে একক কোনো মত নেই। এর সূচনা, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা এবং উদযাপনের ধরন নিয়ে ইতিহাসবিদ ও আলেমদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা।

সূত্র: আরবি পোস্ট

আরও পড়ুন