EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

স্মার্টফোন কি কেড়ে নিচ্ছে আপনার নামাজের একাগ্রতা?

প্রযুক্তির জোয়ারে হারিয়ে যাচ্ছে সালাতের প্রকৃত স্বাদ; খুশু-খুজু ও একাগ্রতা ফেরানোর উপায়

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৬ এএম

স্মার্টফোন কি কেড়ে নিচ্ছে আপনার নামাজের একাগ্রতা?

নামাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতা (খুশু) বজায় রাখা মুমিনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। / প্রতীকী ছবি

অ অ

প্রযুক্তি আজ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কিন্তু যে প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে, সেই প্রযুক্তিই যেন নীরবে কেড়ে নিচ্ছে আমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান ইবাদত— নামাজের একাগ্রতা।

আজ আমাদের মধ্যে অনেকেই নামাজে দাঁড়িয়েও অবচেতন মনে কাজের চিন্তা, মেসেজ, নোটিফিকেশন, ফেসবুক বা ফোনকলের কথা ভাবতে থাকেন। রুকু-সেজদায় থেকেও মনে প্রশ্ন জাগে— কেউ ফোন দিচ্ছে না তো? অথবা নামাজ শেষ করেই কাকে দ্রুত টেক্সট পাঠাতে হবে, সেই ছক চলতে থাকে মাথায়। ফলশ্রুতিতে, মন ঘুরে বেড়ায় কর্মস্থলে বা মোবাইলের পর্দায়; আর আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আমাদের অসাড় শরীরটি।

পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সফল মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন: ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে; যারা তাদের সালাতে বিনয়ী ও একাগ্র।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)

এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, শুধু দায়সারাভাবে নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়; বরং নামাজে মোনযোগ ও বিনয় (খুশু) অর্জন করা অপরিহার্য। 

আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন, ‘ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। আর এটি অবশ্যই কঠিন, তবে খুশুসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য নয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫)। 

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, যে নামাজে পরিপূর্ণ মনোযোগ থাকে না, সে নামাজ আদায় হলেও তার প্রকৃত সওয়াব ও স্বাদ পাওয়া যায় না (মাআরিফুল কুরআন)।

মনোযোগের ওপর নির্ভর করে সালাতের সওয়াব

আমরা নামাজে কতটুকু মন দিতে পারছি, তার ওপরই নির্ভর করে আমাদের সওয়াবের পরিমাণ। এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা নামাজ আদায় করে, অথচ তার জন্য কখনো ১০ ভাগের এক ভাগ, কখনো ৯ ভাগের এক ভাগ, কখনো আট ভাগের এক ভাগ— এভাবে যতটুকু মনোযোগ ছিল, ততটুকুই সওয়াব লেখা হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৭৯৬)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যতক্ষণ বান্দা সালাতে এদিক-সেদিক না তাকায়, ততক্ষণ আল্লাহ তার দিকে মনোযোগ রাখেন। আর যখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহও তার থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে নেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৮৬৩)

মনোযোগহীনতার নেপথ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বারবার স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন চেক করার অভ্যাস মানুষের গভীর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই ডিজিটাল আসক্তি আমাদের নামাজেও প্রভাব ফেলছে। নামাজের আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ক্রিন স্ক্রল করার পর হঠাৎ সম্পূর্ণ মনোযোগ নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো মনস্তাত্ত্বিকভাবেই কঠিন। আবার অনেকের ফোন সাইলেন্ট না থাকায় নামাজের মাঝেই রিংটোনের শব্দে পুরো জামাতের মনোযোগ নষ্ট হয়।

অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের আগে মনোযোগ নষ্টকারী সমস্ত বিষয় দূরে রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন খাবার উপস্থিত থাকে এবং পেশাব-পায়খানার চাপ থাকে, তখন নামাজ নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ৫৬০)। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, মনের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী বিষয় থেকে মুক্ত হয়ে নামাজে দাঁড়ানো উচিত।

নামাজে একাগ্রতা ফিরিয়ে আনার কিছু উপায়

১. নামাজের অন্তত ৫ মিনিট আগে ফোন থেকে বিচ্ছিন্ন হোন। ফোন সাইলেন্ট বা বন্ধ করে দৃষ্টির আড়ালে রাখুন।

২. অজু করার সময় থেকেই দুনিয়াবি চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে মনকে আল্লাহর স্মরণের জন্য প্রস্তুত করুন।

৩. সালাতে যে সুরা বা দোয়া পড়া হচ্ছে, সেগুলোর অর্থ মনে মনে অনুধাবন করা এবং সেজদার স্থানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৪. আজানের ধ্বনি শোনা মাত্রই দুনিয়ার সব ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এমনভাবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো উচিত, যেন এটাই জীবনের শেষ সুযোগ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমনভাবে সালাত আদায় কর, যেন এটি তোমার জীবনের শেষ সালাত।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪১৭১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি সালাতকে হৃদয়ের প্রশান্তি, ঈমানের শক্তি ও আখিরাতের সফলতার পাথেয় হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

আরও পড়ুন