EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

খেলাধুলায় কোনো দেশকে সমর্থন করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ এএম

খেলাধুলায় কোনো দেশকে সমর্থন করা কি জায়েজ?
অ অ

খেলাধুলা মানুষের বিনোদন, শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানসিক প্রশান্তির একটি বৈধ মাধ্যম। যুগে যুগে মানুষ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে আনন্দ-উৎসব করেছে এবং প্রিয় দল বা দেশের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে।

বিশেষ করে বিশ্বকাপ, অলিম্পিক কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-ফুটবল প্রতিযোগিতার সময় দেশ-সমর্থনের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। তবে একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—খেলাধুলায় কোনো দেশ বা দলকে সমর্থন করা কি শরীয়তসম্মত? এটি কি বৈধ ভালোবাসা ও স্বাভাবিক আগ্রহের অন্তর্ভুক্ত, নাকি তা অন্ধ পক্ষপাতিত্ব ও গুনাহের পর্যায়ে পড়ে?

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না; বরং তা সঠিক নীতিমালার মধ্যে পরিচালিত করতে শিক্ষা দেয়। তাই খেলাধুলায় দেশ-সমর্থনের বিষয়টিও ইসলামের মূলনীতি, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা এবং ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডে বিচার করা প্রয়োজন।

ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলার বৈধতা

ইসলাম উপকারী ও কল্যাণকর খেলাধুলাকে বৈধ ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ঘোড়দৌড়, তীরন্দাজি, কুস্তি ইত্যাদি উৎসাহিত করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)

এ থেকে বোঝা যায়, শরীরচর্চা ও উপকারী খেলাধুলা ইসলামে প্রশংসনীয়।

দেশকে সমর্থন করার হুকুম

কোনো খেলায় একটি দেশকে সমর্থন করা মূলত নাজায়েজ নয়। কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক পছন্দ ও আবেগের বিষয়। কেউ নিজের জন্মভূমি, সংস্কৃতি কিংবা পছন্দের খেলোয়াড়ের কারণে একটি দলকে সমর্থন করতে পারে। তবে এই সমর্থন তখনই বৈধ থাকবে, যখন তা শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকবে এবং অন্ধ পক্ষপাতিত্বে পরিণত হবে না। কেননা ইসলাম অন্ধ দলীয় পক্ষপাতিত্ব নিষিদ্ধ করেছে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনরা! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়। (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)

এই আয়াত শিক্ষা দেয় যে, কোনো ব্যক্তি, দল বা দেশের প্রতি ভালোবাসা যেন আমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে। আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো; এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৮)

অতএব, খেলার মাঠেও ন্যায়-অন্যায়ের বিচার হারিয়ে ফেলা যাবে না।

কাফিরদের ধর্ম ও আদর্শের প্রতি ভালোবাসা নিষিদ্ধ

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি এমন কোনো সম্প্রদায় পাবেন না যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে অথচ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরোধিতাকারীদের প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করে।’ (সুরা : মুজাদালাহ, আয়াত : ২২)

এ আয়াতের অর্থ হলো, একজন মুসলিম কাফিরদের কুফর, ইসলামবিরোধিতা বা আল্লাহ-রাসুলের বিরোধিতাকে ভালোবাসতে পারে না। তাই মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে বিধর্মীদের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত ঘৃণিত একটি কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের (অন্তরঙ্গ অভিভাবক ও আনুগত্যের কেন্দ্র হিসেবে) গ্রহণ কোরো না।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৫১

মুফাসসিররা ব্যাখ্যা করে, এখানে সাধারণ সৌহার্দ্য বা লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং এমন বন্ধুত্ব, আনুগত্য ও সমর্থন নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা মুসলিম পরিচয় ও স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও উত্তম আচরণ করেছেন; কিন্তু তাদের কুফর ও বাতিল বিশ্বাসকে কখনো সমর্থন করেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা দ্বীনের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না।’ (সুরা : মুমতাহিনাহ, আয়াত : ৮)

পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারে সতর্কতা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গোত্রবাদ বা অন্ধ পক্ষপাতিত্বের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫১২১)

আরেক বর্ণনায় তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব পরিত্যাগ করো; এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৯০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৪)

সুতরাং কোনো দেশের সমর্থন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেলে যে, অন্যদের গালি দেওয়া, ঝগড়া করা, শত্রুতা সৃষ্টি করা বা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করা শুরু হয়, তাহলে তা হারাম বা অন্তত গুরুতরভাবে নিন্দনীয় হয়ে যায়।

খেলাধুলায় সমর্থনের ক্ষেত্রে মুসলিমের করণীয়

১. খেলাকে খেলাই মনে করা। খেলাকে জীবনের প্রধান বিষয় বানানো যাবে না। এটি বিনোদনের একটি মাধ্যম মাত্র।

২. ফরজ ইবাদত অবহেলা না করা। কোনো ম্যাচের কারণে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য দ্বীনি দায়িত্ব অবহেলা করা বৈধ নয়।

৩. গালি ও কটূক্তি পরিহার করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন গালি দেয় না এবং অভিশাপও দেয় না।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭)

৪. ভ্রাতৃত্ব নষ্ট না করা। একটি খেলার কারণে বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা বা মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করা অত্যন্ত অনুচিত।

৫. জুয়া ও হারাম কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা। খেলার ফলাফল নিয়ে বাজি ধরা, জুয়া খেলা বা অর্থ লেনদেন করা স্পষ্ট হারাম।

অত্খএব, লাধুলায় কোনো দেশ বা দলকে সমর্থন করা নাজায়েজ বা অবৈধ কোনো বিষয় নয়। তবে তা হতে হবে সীমিত, শালীন এবং শরীয়তের গণ্ডির মধ্যে। যদি সমর্থন অন্ধ পক্ষপাতিত্ব, গালিগালাজ, বিদ্বেষ, মারামারি, অহংকার, জুয়া কিংবা দ্বীনি দায়িত্ব অবহেলার কারণ হয়ে যায়, তাহলে তা গুনাহে পরিণত হবে।

একটি ম্যাচের ফলাফল কখনো মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা বা আল্লাহর আনুগত্যের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই একজন মুমিন খেলাকে বিনোদনের পর্যায়ে রাখবে, অন্ধ পক্ষপাতিত্ব থেকে বেঁচে থাকবে এবং সর্বদা কোরআন-সুন্নাহর আদর্শকে নিজের আবেগের ওপর প্রাধান্য দেবে। তাহলেই তার আনন্দও হবে বৈধ, আর তার চরিত্রও থাকবে ইসলামের সৌন্দর্যে অলংকৃত।

আরও পড়ুন