EN ☀️
×

Follow Us

ধর্ম

বৈশাখি উৎসবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫১ এএম

বৈশাখি উৎসবে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

ছবি: সংগৃহীত

অ অ

ইসলামে উৎপাদনমুখী তৎপরতা, নির্দোষ বিনোদন সমর্থিত। বৈশাখের অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’। উদ্দেশ্য ‘উশর’ ‘খারাজ’ বা ফসলি কর পরিশোধের আনন্দ প্রকাশ এবং ব্যবসায়ের হিসাব ও খাজনা ‘রাজকীয় খাতায় হাল নাগাদ’ করা। এ উপলক্ষ্যে রাজা-জমিদারকে প্রজারা তাদের সৃজনশীল পণ্য, সূচিকর্ম উপহার দিতেন। রাজা-জমিদাররাও প্রজাদের ‘কর রেয়াত' ও ‘ইনাম’ দিতেন।

মেহনতি কৃষকের উচ্চারণ-

‘ধান ফুরালো, পান ফুরালো, খাজনার উপায় কী,

আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি...’

অথবা, ‘নয়া বাড়ির নয়া বাইদ্যা লাগায় স্বাদের সাজনা,

সেই সাজনা বেচিয়া দিবো জমিদারের খাজনা...’

মানুষের শৈল্পিকনৈপণ্য প্রদর্শন এবং সাংবৎসরিক প্রয়োজনীয় অথবা শৌখিন পণ্যের বেচাকেনার জন্য ‘বৈশাখি মেলা’ লোকবাংলার ঐতিহ্য। অথচ বর্তমানে পয়লা বৈশাখ কেবলই একদিনের সস্তা বিনোদন। এতে নেই মেঠো বাঙালির ‘সোনা ছোঁয়া মাটির' সৌরভ। 

বাংলা নববর্ষের ক্রমবিবর্তনের আছে মুসলিম ঐতিহ্য। এতে ইরান ও আরবের বিভিন্ন দেশের নববর্ষ ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের যোগসূত্র লক্ষণীয়। ‘সন’ ‘তারিখ’ আরবি, ‘সাল’ ফারসি শব্দ স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা সনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পৃক্ততা।

বাংলা সনের বিকাশ ঘটে ফসলি কর ‘উশরে’র দায়বদ্ধতায়। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ‘উশর’ (মুসলমানদের ফসলি কর) বাধ্যতামূলক। মহান আল্লাহর নির্দেশ- ‘যখন ফসল পাকে, তখন তা খাও এবং ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর হক (দুস্থজনের হক) আদায় করো।’ (সুরা আন-আম, আয়াত: ১৪১) 

তিনি আরও বলেন, ‘যা আমি তোমাদের ভূমি থেকে উৎপাদন করেছি, তা থেকে পবিত্র (উত্তম) অংশ খরচ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৭)

প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ফসলের ১০ ভাগের একভাগ এবং সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রম ব্যয়ে উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের একভাগ দানকে ‘ফসলি কর’ উশর বলে। ইমাম শাফেঈ (রহ.), উশরের ন্যূনতম একক (নিসাব) ঠিক করেছেন ২৬ মণ ২৮ সের ০৯ ছটাক (সাড়ে ০৬ কুইন্টাইল, ৭৫৫ গ্রাম)। 

অর্থাৎ এতে উশরের পরিমাণ দাঁড়াবে ০১ মণ সাড়ে ১৩ সের ধান বা ৩৫ কেজি চাল। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)- এর মতে, ফসলের পরিমাণ যা-ই হোক, তা থেকে উশর আদায় করতে হবে।

সম্রাট আকবরের শাসনামলে মুসলমানদের ফসলি কর ‘উশর’ এবং অমুসলিমদের ভূমি কর ‘খারাজ’ আদায়ের ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের গণনা রীতির ব্যবধানে তৈরি হয় জটিলতা। তখন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে আকবরের সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি একটি নতুন সৌরবর্ষ উদ্ভাবন করেন। 

সম্রাট আকবর ফরমান জারির মাধ্যমে এ নতুন সন গণনা করেন এবং সূচনা বছর হিসেবে ধরা হয় তার মসনদে আরোহণের বছর, ১৫৫৬ খ্রি./ ৯৬৩ হিজরি। তখন সুবে বাংলায় মহরম মাসে ছিলো বৈশাখ। ফলে নতুন বছরের প্রথম মাস হয়ে গেলো বৈশাখ। 

১২০১ খ্রি./ ৫৯৮ হি. মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ (০৪ মার্চ ১৯২৭ খ্রি.) রচিত হয়- ‘এসো হে বৈশাখ... মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা...।’

১৯৫৪ খ্রি. ‘যুক্তফ্রন্ট’ ক্ষমতায় এলে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে অভিনন্দন জানান। ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র ভাষায় আবাহন:

‘আইল নতুন বছর লইয়া নব সাজ,

কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’

ইসলামী সংস্কৃতি হলো, মানুষের ব্যাবহারিক কর্মকাণ্ডে রুচিশীল ও কল্যাণকর বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। প্রিয় নবী (স.)- এর আবির্ভাব এবং পবিত্র কোরআন অবতরণের ফলে অনাচার, অসভ্য, অসত্যের নিকষ অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা হয়। 

দেশভ্রমণ, বৈদেশিক বাণিজ্য, অতিথি সেবা, বীরত্ব, কবিত্ব, সাহিত্যচর্চায় আরববাসীর সুখ্যাতি ছিলো। তবু প্রিয় নবী (সা.)- এর নবুয়তপূর্ব সময়কে ‘মূর্খতার যুগ’ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। 

‘উকাজের মেলা’ উপলক্ষ্যে ঘোড়দৌড়, কবির লড়াই, কবিতা পাঠ ইত্যাদির আড়ালে মদ, মূর্তি, জুয়া, লটারি, অবৈধ পণ্যের বেশাতিতে মানুষের জীবন-সম্ভ্রমের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতো। উৎসবের বেলেল্লাপনার পটভূমিতেই সুরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াত নাজিলের মাধ্যমে মদ, মূর্তি, জুয়া, লটারিকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি একে বলা হয়েছে ‘ঘৃণ্য শয়তানি কর্ম’। 

কাজেই জিজ্ঞাসা- খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চুল, কাঁকড় জাতীয় বস্তু যেমন অখাদ্য! তেমনি সংস্কৃতির মধ্যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ কতটুকু যৌক্তিক?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

আরও পড়ুন