কোরআনের আলোয় আলোকিত একটি গ্রামের গল্প
‘মাজালিসে নুর’ (আলোর সভা) নামে পরিচিত একটি আয়োজন পুরো গ্রামবাসীকে কোরআনের ছায়ায় ঐক্যবদ্ধ করেছে।
মুফতি আবদুল্লাহ নুর
প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
নাবিহ সালিহ গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে রমজান শুধু রোজা রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আছে একটি বিশেষ ঐতিহ্য, যা গত ১৫ বছর যাবৎ গ্রামটিকে আলোকিত করে আসছে।
‘মাজালিসে নুর’ (আলোর সভা) নামে পরিচিত একটি আয়োজন পুরো গ্রামবাসীকে কোরআনের ছায়ায় ঐক্যবদ্ধ করেছে। আয়োজনটি ছোট একটি স্থানীয় স্বপ্ন হিসেবেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু আজ তা এমন এক প্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যার জন্য সবাই চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই অপেক্ষা করতে থাকে।
মাজালিসে নুরের যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালে। গ্রামের এক বাসিন্দার মনে একটি সহজ কিন্তু সুন্দর ধারণা আসে। তা হলো, পবিত্র রমজান মাসে কেন পুরো দ্বীপের মানুষকে এক সাথে বসিয়ে সম্মিলিতভাবে কোরআন তিলাওয়াত করা হবে না? তিনি তার এই ভাবনা ইমাম আলী (রা.) সেন্টার ফর ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড কালচার- এর কাছে তুলে ধরেন। তারা এতে সম্মতি জানায়।
এরপর ২০১২ সালে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়। শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম বছর মানুষের তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, মানুষের উপস্থিতিও আয়োজকদের প্রত্যাশা মতো হয়নি। কিন্তু হাল না ছেড়ে কেন্দ্র আরো বড় লক্ষ্য স্থির করে। কেননা তারা বিশ্বাস করত, নাবিহ সালিহর মানুষ সত্যিই বিশেষ কিছু পাওয়ার যোগ্য।
পরে তারা ‘ইকরা’ কোরআনিক সায়েন্সেস অ্যাসোসিয়েশন- এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করে পুরো কর্মসূচিতে নতুন রূপ দেয়। বাহরাইনের বিভিন্ন স্থান থেকে সেরা কারিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। শুধু তিলাওয়াতই নয়, এর সঙ্গে যোগ করা হয় সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ আলোচনা, ভাবনা-চিন্তার আসর এবং আনন্দদায়ক প্রতিযোগিতা।
এই উদ্যোগের ফল ছিল অসাধারণ। দ্বিতীয় বছরেই হলগুলো ভরে যেতে শুরু করে। মানুষ শুধু শুনতে আসত না; তারা এখানে নিজেদের একটি অংশ মনে করত। বয়োজ্যেষ্ঠদের পাশাপাশি তরুণরাও তাতে অংশ নিতে শুরু করে। আর এটাই প্রমাণ করে যে ‘মাজালিস’ ধীরে ধীরে নাবিহ সালিহ গ্রামের রমজানের হৃদয়ে পরিণত হয়েছে।
আজ ১৫ বছর পরও এই ঐতিহ্য আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী। অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত ও সবার জন্য উন্মুক্ত, যাতে প্রত্যেকে নিজেকে স্বাগত মনে করে। মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে এবং সম্প্রদায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে প্রতিদিন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য পুরস্কার লটারির আয়োজন করা হয়, যা আধ্যাত্মিক পরিবেশে একটুখানি আনন্দও যোগ করে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ভেতরও মাজালিসে নুরে সমান উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে; এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এতে আরো বেশিসংখ্যক মানুষ যোগ দেয়। মাঝে মাঝে সতর্কতার সাইরেন শোনা গেলেও তা খুব কমই অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ নষ্ট করে। কেননা, প্রতিদিনের কোরআন তিলাওয়াত সম্পূর্ণ করা এবং একসঙ্গে এর বরকত ভাগ করে নেওয়ার গভীর ইচ্ছা অন্তরে লালন করে।
সূত্র: নিউজ অব বাহরাইন