EN ☀️
×

Follow Us

প্রবাস

আলতাব আলী পার্ক

লন্ডনের বুকে ‘একখণ্ড বাংলাদেশ’

এই পার্কের নামকরণের পেছনে মিশে আছে এক বিষাদময় কিন্তু লড়াকু ইতিহাস।

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২৫ এএম

লন্ডনের বুকে ‘একখণ্ড বাংলাদেশ’
অ অ

লন্ডনের ব্যস্ততম হোয়াইটচ্যাপেল এলাকা। চারদিকে গগনচুম্বী দালান আর বিলেতি ব্যস্ততা। কিন্তু এর মাঝেই পূর্ব লন্ডনের এডলার স্ট্রিটে পা রাখলে মনে হবে- আপনি হঠাৎ কোনো এক জাদুবলে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। চারদিকে সবুজ ঘাস, উঁচু গাছপালা আর তার মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে গড়া একটি মিনার। এটিই ঐতিহাসিক ‘আলতাব আলী পার্ক’, যা বিলেতের মাটিতে বাঙালির অধিকার রক্ষা ও শেকড়ের টানের এক জীবন্ত দলিল।

এই পার্কের নামকরণের পেছনে মিশে আছে এক বিষাদময় কিন্তু লড়াকু ইতিহাস। সত্তরের দশকে ব্রিটেনে তখন বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। ১৯৭৮ সালের ৪ মে, কারখানা শ্রমিক তরুণ বাঙালি আলতাব আলী কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন। পথে এডলার স্ট্রিটে অজ্ঞাত কয়েকজন বর্ণবাদীর নির্মম ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান তিনি।

আলতাব আলীর এই মৃত্যু সেদিন লন্ডনের বাঙালিদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন, যা ব্রিটেনের ইতিহাসে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এক বিশাল ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। সেই বীরত্বগাথাকে অমর করে রাখতেই ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সেন্ট মেরিস পার্কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আলতাব আলী পার্ক’।


পার্কের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে শুভ্র এক শহীদ মিনার। ১৯৯৯ সালে পার্কের দক্ষিণ অংশে এটি নির্মাণ করা হয়, যা দেশের বাইরে নির্মিত প্রথম কোনো শহীদ মিনার। তৎকালীন স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সেই চিরাচরিত ‘মা ও শহীদ সন্তানদের’ অবয়ব এখানেও এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই পার্ক কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি তাদের সুখ-দুঃখের আড্ডাস্থল। ছুটির দিনে এখানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দলবেঁধে ঘুরতে আসেন, চলে জমজমাট আড্ডা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক যেকোনো বড় ঘটনায় লন্ডনে অবস্থানরত অভিবাসীরা এই পার্কেই সমবেত হয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানান।

আজ মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনার চত্বর আল্পনায় রঙিন হয়ে উঠেছে। রাত ১২টা ১ মিনিট থেকেই নগ্নপদে ফুল হাতে এখানে ভিড় করছেন শত শত প্রবাসী বাঙালি। বিদেশের মাটিতে থেকেও নিজ ভাষার প্রতি এই অগাধ শ্রদ্ধা দেখে ভিনদেশিরাও মুগ্ধ হন।

লন্ডনের এই একখণ্ড বাংলাদেশ একদিকে যেমন প্রবাসে বাঙালির বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক, তেমনি তা সাত সমুদ্র তেরো নদী দূরের দেশমাতৃকার সঙ্গে অভিবাসী বাঙালির এক নিবিড় যোগসূত্র। আলতাব আলীর রক্ত আর বায়ান্নর শহীদদের আত্মত্যাগ- সব মিলেমিশে এই পার্কটি হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন বাঙালির এক গর্বিত ঠিকানা।

আরও পড়ুন