Logo
EN
×

Follow Us

বাংলাদেশ

নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি নাজুক প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক নীতি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ওই মিশন গত ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করে।

ডেইলি সান রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫

নির্বাচনপূর্ব পরিস্থিতি নাজুক প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন

ছবি: সংগ্রহীত

নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না রাখার সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কতটা প্রতিনিধিত্বশীল থাকছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এটি ভোটের দিনে সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে কি না- এমন শঙ্কাও আছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) বাংলাদেশ প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নীতি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ওই মিশন গত ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করে। দেশের নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে আইআরআই মিশন এ দেশের নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

আইআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে ব্যাপক সমর্থন আছে। তবে প্রক্রিয়াগত অস্পষ্টতা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতভেদের কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাড়ানো ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি জোরদারের লক্ষ্যে একাধিক সংস্কার বাস্তবায়ন করেছে। এগুলোর মধ্যে প্রবাসী ভোটারদের জন্য ভোট প্রদানের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। নির্বাচনী নিরাপত্তা জোরদারের জন্য কমিশন সশস্ত্র বাহিনীকে নিরাপত্তাকাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

তবু নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ এখনো নাজুক। মাঝেমধ্যে  রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সহিংসতা ঘটছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতি অবিশ্বাসও পুরোপুরি কাটেনি।

আইআরআই বলছে, যুব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর উত্থান এবং প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আসা বিপুলসংখ্যক তরুণ ও প্রবাসী ভোটারের প্রত্যাশিত অংশগ্রহণ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার এক সম্ভাব্য রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।

এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার ধারাবাহিক প্রভাবকেও প্রতিফলিত করে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ও নারীদের সীমিত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। ক্রমবর্ধমান উগ্রপন্থী ও কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এটি অসহিষ্ণু প্রবণতা উসকে দিতে পারে এবং বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

আইআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক দলগুলো কতটা গণতান্ত্রিক মানদণ্ড, বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলনের প্রচারিত আদর্শগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, তার ওপরই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

আইআরআই বলেছে, ‘বাংলাদেশ যখন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে যে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কার আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বিশ্বস্ত ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় কি না। অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সক্ষমতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার এজেন্ডাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দক্ষতার ওপর। জুলাই জাতীয় সনদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথনকশার পূর্ণ বাস্তবায়ন অনেকাংশেই পরবর্তী সংসদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।’

আইআরআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ। বহু অংশীদার এই নির্বাচনকে জুলাই সনদের অধীনে শুরু হওয়া সংস্কারগুলোকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছে। জুলাই সনদের সাংবিধানিক বৈধতা, নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোর কার্যকর রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত হওয়ার সক্ষমতা এবং সংস্কার ব্যবস্থাপনায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জন-অসন্তোষ- এসব উপাদানই শেষ পর্যন্ত এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

পূর্ণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ক্রমশ আরো বহুমাত্রিক ও বহুদলীয় হয়ে উঠেছে, যেখানে বহু নতুন ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিচ্ছে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এখনো দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে তারা উল্লেখযোগ্য অভ্যন্তরীণ ও ভাবমূর্তিগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

আইআরআই বলেছে, ‘দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং এটি ভোটের দিনে সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে কি না, সে বিষয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।’

আইআরআই বলেছে, দলীয় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা মাঝেমধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতার সৃষ্টি করেছে। মনোনয়ন ও প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে কিছু এলাকায় কিছু দল স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালাতে না পারায় স্থানীয় পর্যায়ে উন্মুক্ত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরো সীমিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক গতিশীলতা এখনো পরিবর্তনশীল। জোট পরিবর্তন ও নতুন উদীয়মান শক্তিগুলো সংস্কার-পরবর্তী পরিবর্তনকে প্রভাবিত করার জন্য প্রতিযোগিতা করছে। এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই নির্বাচন কতটা বিস্তৃত রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে প্রতিফলিত করবে। অনেক অংশীদার জোর দিয়ে বলেছেন, ফল যা-ই হোক না কেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে সব দলের গঠনমূলকভাবে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের ইচ্ছা, নির্বাচনী কাঠামো মেনে চলা এবং শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার প্রতি টেকসই অঙ্গীকার প্রদর্শনের ওপর।’

আইআরআই আরো স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে আট দফা সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো- জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চূড়ান্ত করা, নাগরিক শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক সচেতনতা জোরদার করা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা, প্রার্থী নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সমন্বয় বাড়ানো, নাগরিক পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক তহবিলে স্বচ্ছতা এবং  স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পরিবেশ তৈরি করা।

আইআরআই বলেছে, গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও পক্ষপাতমুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক বা আর্থিক চাপ বন্ধ করতে হবে। নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন কমিশনকে যৌথভাবে ভোটারদের ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও বাস্তব তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে হবে।

আগামী নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা করে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের মূল্যায়নের সঙ্গে সরকারের কোনো দ্বিমত নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ।

মূল্যায়ন নিয়ে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফয়েজ আহম্মদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা যখন থেকে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা বা নির্বাচন কবে হবে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বলেছেন, একই সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সেখানেও বারবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে কারা কিভাবে নির্বাচন বানচালের জন্য নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করবে। সে বিষয়ে জাতি মোটামুটি অবগত এবং সরকারের দিক থেকে যেটা করার সরকার সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আইআরআইয়ের যে ফাইন্ডিংস বা আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে সরকারের কোনো দ্বিমত নেই। সরকারও এসব বিষয়ে অবগত আছে এবং সেই বিষয়ে সক্রিয়ভাবে যেসব প্রস্তুতি নেওয়া দরকার সেগুলো নিচ্ছে।

আরও পড়ুন