বিধ্বস্ত গাজা ভূখণ্ডে গিয়ে যে ভয়াবহ চিত্র দেখল বিবিসি
ফিলিস্তিনিদের স্মৃতিতে থাকা মানচিত্র আর ভূখণ্ড প্রায় নেই বললেই চলে
ডেইলি সান রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫
গাজা উপত্যকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপের ধূসর প্রান্তর। বেইত হানুন থেকে গাজা সিটি পর্যন্ত ১৮০ ডিগ্রি জুড়েই ধ্বংসলীলা স্পষ্ট।
ফিলিস্তিনিদের স্মৃতিতে থাকা মানচিত্র আর ভূখণ্ড প্রায় নেই বললেই চলে। দূরবর্তী কিছু ভবন ছাড়া গাজা সিটির এই এলাকাগুলো একসময়কার হাজারো মানুষের বসতি ছিল, যা আজ আর চেনার উপায় নেই।
এই অঞ্চলটি ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর প্রথম প্রবেশ করা এলাকাগুলোর মধ্যে একটি। হামাস এখানে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা করায় ইসরায়েলি বাহিনী বারবার অভিযান চালিয়েছে। ইসরায়েল কোনো সংবাদ সংস্থাকে স্বাধীনভাবে গাজায় রিপোর্ট করার অনুমতি দেয়নি।
তবে সম্প্রতি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রশাসন বিবিসি-সহ একদল সাংবাদিককে ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা উপত্যকার একটি অংশ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত সফরে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। এই সফরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলা বা অন্য এলাকায় যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সামরিক সেন্সরশিপ আইনের কারণে সাংবাদিকদের রিপোর্ট প্রকাশের আগে সামরিক কর্মীদের দেখাতে হয়েছে, যদিও বিবিসি তাদের সম্পাদকীয় নীতি বজায় রাখার দাবি করেছে।
ধ্বংসের মাত্রা নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র নাদাভ শোশানি বলেন, ‘ধ্বংস আমাদের লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা।’
তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সুড়ঙ্গের মুখ, ফাঁদ, আরপিজি বা স্নাইপার স্টেশন ছিল। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ৭ই অক্টোবর এটাই ঘটেছিল: "যদি আপনি দ্রুত গাড়ি চালান এক মিনিটের মধ্যে একজন ইসরায়েলি দাদি বা শিশুর বসার ঘরে ঢুকে যেতে পারেন।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান ও ইতাই চেনের দেহাবশেষ
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১১শ জনের বেশি ইসরায়েলি নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। অন্যদিকে, হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে গাজায় ৬৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শোশানি জানান, এই এলাকাতেই ইতাই চেনসহ কয়েকজন জিম্মির দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। ইতাই চেনের দেহাবশেষ এই সপ্তাহে হামাস ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করেছে।
ইয়েলো লাইন ও শান্তি পরিকল্পনার ভঙ্গুরতা
বিবিসি যে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিতে গিয়েছিল, সেটি ইয়েলো লাইন (হলুদ রেখা) থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় এই অস্থায়ী সীমানা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকাকে পৃথক করে। প্রায় এক মাস ধরে যুদ্ধবিরতি চললেও, ইসরায়েলি বাহিনী বলছে তারা হলুদ রেখা বরাবর হামাস বন্দুকধারীদের সাথে প্রায় প্রতিদিনই লড়াই করছে। হামাস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শত শত বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, যার ফলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
কর্নেল শোশানি বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী মার্কিন-নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে হামাস যেন আর ইসরায়েলি বেসামরিকদের জন্য হুমকি না হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে তারা ততদিনই থাকবে যতদিন প্রয়োজন।
সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক এবং গাজার ভবিষ্যৎ
মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে গঠিত ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা। কিন্তু কর্নেল শোশানি অভিযোগ করেন, হামাস উল্টো নিজেদেরকে আরও সশস্ত্র করার চেষ্টা করছে এবং গাজায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
ইসরায়েলি বাহিনী সাংবাদিকদের সুড়ঙ্গের একটি মানচিত্র দেখিয়েছে, যা তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে খুঁজে পেয়েছে। তারা এটিকে মাকড়সার জালের মতো বিশাল নেটওয়ার্ক বলে বর্ণনা করেছে।
এই যুদ্ধবিরতি গাজাকে এক অস্থির দোলাচলে রেখেছে। ইতোমধ্যে দুবার যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রও পরিস্থিতিটির ভঙ্গুরতা সম্পর্কে অবগত। ওয়াশিংটন তথাকথিত ‘টেকসই শান্তির’ দিকে জোর দিচ্ছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের কাছে একটি খসড়া প্রস্তাব পাঠিয়েছে। বিবিসির দেখা সেই নথিতে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার নিরাপত্তা পরিচালনার জন্য দুই বছরের ম্যান্ডেটসহ একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তবে এই চুক্তির পরবর্তী ধাপের বিস্তারিত তথ্য এখনও অস্পষ্ট।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গাজাকে বিলাসবহুল কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আজকের গাজার বাস্তব চিত্র তার থেকে অনেক দূরে। ইসরায়েলের হাতে ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা এই গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কেবল যুদ্ধ থামানোই মূল প্রশ্ন নয়, বরং গাজার সাধারণ মানুষ তাদের নিজের সম্প্রদায় ও ভূমির ভবিষ্যতের উপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।