Logo
EN
×

Follow Us

ধর্ম ও জীবন

ইসলাম চায় এক স্বভাবানুকূল পরিবেশ

ইসলাম হলো জীবন্ত এক জীবনাদর্শ। এটি বুদ্ধিজাত তত্ত্বগত কোনো দর্শন নয়, যার স্থান হলো মস্তিষ্কের কোনো নিভৃত কোণ বা গ্রন্থাগারের নীরব প্রকোষ্ঠ।

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫

ইসলাম চায় এক স্বভাবানুকূল পরিবেশ

ছবি: সংগৃহীত

আমরা জানি, ইসলাম হলো ফিতরাতের ধর্ম, মানুষের স্বভাবধর্ম। প্রকৃতি যেমন স্বাভাবিক পরিবেশে ফুলে-ফলে ভরে ওঠে, সতেজ হয়, প্রাণ পায়, তেমনি ইসলামও স্বাভাবিক পরিবেশেই সতেজভাবে বেড়ে ওঠে।

একটা চারাগাছ একটা স্বাভাবিক পরিবেশ চায়, তখনই তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলন ঘটে। কিন্তু আগাছা যদি তাকে বেষ্টন করে ফেলে, তবে তার প্রাণশক্তি যায় নষ্ট হয়ে। তার স্বভাববৃদ্ধির হ্রাস ঘটে। তেমনি অনুকূল স্বভাব পরিবেশ না হলে, কুফর, শিরক ও বিদআতের আগাছা যদি সেই পরিবেশকে গ্রাস করে, তখন ইসলামের স্বভাব বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। মুসলিমদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে সেই অস্বাভাবিক পরিবেশে জীবনযাপন কঠিনতর হয়ে ওঠে। তাই ইসলাম সব সময়ই শান্ত ও সুস্থির পরিবেশকে বজায় রাখতে চায়।

আমরা দেখি, কী কঠিন শর্ত এবং আপাতদৃষ্টিতে ইসলামের প্রতিকূল শর্তেও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়ার সন্ধি মেনে নিয়েছিলেন। পরিণামে কিছুদিনের জন্যও শান্তির পরিবেশ পাওয়ায় ইসলাম শতগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। হুদাইবিয়ায় সাহাবিদের উপস্থিতি ছিল এক হাজার ৫০০, কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই মক্কা বিজয়ের সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী ছিলেন ১০ হাজার সাহাবি।

তেমনি মক্কা বিজয়ের পর শান্তিময় পরিবেশে ইসলামের বৃদ্ধি ঘটেছিল সহস্র গুণে। মক্কা বিজয়ের দুই বছরেই দশম হিজরি সনে বিদায় হজের সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গী ছিলেন বর্ণনাভেদে সোয়া লাখ সাহাবি।
নবী ও রাসুলরা সব সময় চেয়েছেন একটি পরিবেশ গঠন করতে। হিজরতের আগে বহু গোত্র-বংশের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা নিরাপদ পরিবেশের দাওয়াত দিয়েছিলেন। শেষে মদিনার আনসারীরা এর নিশ্চয়তা দিলে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। এই হিজরতের অন্যতম কারণ ছিল এক নিরাপদ ও শান্তিময় পরিবেশে ইসলামানুগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

ইসলাম চায় উপযোগী এক ঋতুকাল। ইসলাম হলো জীবন্ত এক জীবনাদর্শ। এটি বুদ্ধিজাত তত্ত্বগত কোনো দর্শন নয়, যার স্থান হলো মস্তিষ্কের কোনো নিভৃত কোণ বা গ্রন্থাগারের নীরব প্রকোষ্ঠ। এ তো হলো একই সঙ্গে আকিদা ও আমল, প্রত্যয় ও বাস্তবায়ন, চরিত্র ও নৈতিকতা, আবেগ ও উপলব্ধি, সচেতনতা ও সুরুচিতার মিশ্রণ এবং সমন্বিত এক বিষয়। মানুষকে সে নয়া এক ছাঁচে ঢেলে নিতে চায়, জীবনকে সে নতুন এক রঙে রাঙায়।

অন্য সব আদর্শের তুলনায় ইসলাম অনেক বেশি স্পর্শকাতর ও অনুভূতিশীল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান সিরাত; তাঁর হেদায়েত ও দিকনির্দেশনা, তাঁর অনুপম আদর্শ, আকিদা ও ইবাদত থেকে নিয়ে চরিত্র মাধুরী, নৈতিকতা, লেনদেন, আচার-আচরণ, এমনকি আবেগ-অনুভূতি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে দ্বিনের জন্য এক পরিবেশ এমন উপযোগী ও অনুকূল করে গড়ে তোলে; যেখানে ঈমানের ‘শাজারাতান তায়্যিবাতান’, পবিত্র চারাটি সতেজ ও পেলব হয়ে ওঠে, মহীরুহ ও ফলবন্ত হয়ে ওঠে। এই দ্বিন হলো মানবজীবনের সব ধরনের গুণ ও বিশেষণ, তার টিকে থাকার সব শর্ত ও চাহিদার সমন্বিত সংকলন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবেগ, চেতনা, উপলব্ধি ও প্রেরণায় তার বাস্তবায়িত নিদর্শনগুলোর উদাহরণ বৈ জিন্দা থাকতে পারে না। তাই ফিরে যেতে হয় বারবার তাঁরই কাছে, তাঁরই যুগে, খায়রুল কুরুনের ছায়ায়।

কিন্তু কুফরি ও শিরকি আগাছারা প্রথম থেকেই নানা বাধার পাহাড় খাড়া করে ইসলামের গতিকে রুদ্ধ করতে চেয়েছে। অত্যাচার, নির্যাতন, যুদ্ধবিগ্রহ, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, পরিহাস, তিরস্কার, অপপ্রচার ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডার আড়ালে ইসলামের আলোকে ঢেকে ফেলতে প্রয়াসী হয়েছে। ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি উদাহরণ বিদ্যমান।

কিন্তু যে আলোকে আল্লাহ চান পূর্ণতায় উদ্ভাসিত করতে, তা রুখবে সে কোন জন? কেমনে?

আল্লাহ তো তাঁর জ্যোতির্ময় আলোকে পূর্ণতায় পৌঁছবেনই যদিও তা না-পছন্দ মুশরিকদের, কুফরি শক্তির। (সুরা: আস-সফ, আয়াত: ৮)

(লেখকের সদ্য প্রকাশিত ‘মিযাজে শরীআত’ গ্রন্থ থেকে)

আরও পড়ুন